শিশুধর্ষণ: অপরাধীর ফাঁসি নাকি সমাজের পরিবর্তন?

JANUARY 9,2018

শিশুধর্ষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ছেলেশিশু মেয়েশিশু কেউ রেহাই পাচ্ছে না। পিতারাও এখন তাদের কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করছে। মসজিদ মাদ্রাসায়, ঘরে বাইরে শিশুধর্ষণ চলছেই। এক লোককে শিশুধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মৃত্যুদন্ড দিয়ে কোনও ধর্ষণ এবং খুনই এ যাবৎ বন্ধ করা যায়নি। শিশুধর্ষণও বন্ধ করা যাবে না। মৃত্যুদণ্ড দিয়ে   ভয় দেখানো যায়, কিন্তু অপরাধ যে সমাজ উৎপন্ন করে, সে সমাজ বদলানো যায় না।  

কারা ধর্ষণ করে? পুরুষ। মূলত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। তারা তো জন্ম থেকে শিশুধর্ষক বা শিশুখুনী হয়ে জন্মায় না। তাহলে কে তাদের শেখায় শিশুদের ধর্ষণ করতে? তারা কোত্থেকে আইডিয়া পায় ধর্ষণের? তারা কি বই পড়ে শেখে ধর্ষণ করতে? কোনও বইয়ে কি লেখা আছে শিশুদের ধর্ষণ করা উচিত? ধর্ষণ করার জন্য কোনও নাটকে থিয়েটারে সিনেমায় বলা হয়? তাও তো হয় না। তাহলে কোত্থেকে শেখে? নিশ্চয়ই তার চারদিক থেকে, অর্থাৎ পরিবার থেকে, সমাজ থেকে শেখে। কী দেখছে সে পরিবারে, সমাজে, ধর্মে, রাষ্ট্রে? দেখছে পুরুষের স্থান ওপরে, নারীর স্থান নিচে। পুরুষ সবল, নারী দুর্বল। পুরুষের দাপট আছে, নারীর দাপট নেই। পুরুষ মারে, নারী মার খায়। রাষ্ট্রের আইনে দেখছে, পুরুষের অধিকার সর্বোচ্চ, নারীর অধিকার নেই বললেই চলে, থাকলেও নগন্য। রাস্তাঘাটে দেখছে নারী নিগৃহীত হচ্ছে, নারী যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে, এতে কারও হেলদোল নেই।  পুরুষেরা জেনে যাচ্ছে নারী নিতান্তই যৌনবস্তু। নারী যৌনবস্তু, সে কারণে পতিতালয় খোলা হয়েছে, পুরুষেরা যেন   যৌনদাসি ভোগ করতে পারে। এসব দেখতে দেখতেই পুরুষদের বিশ্বাস জন্মে নারী যৌনদাসি ছাড়া কিছু নয়। 

পুরুষেরা দীর্ঘকাল থেকে ওয়াজ শুনছে, ওয়াজে ধর্মগুরুরা প্রতিনিয়ত বলছে নারীকে পুরুষের সেবার জন্য, এবং ভোগের জন্য বানানো হয়েছে। পুরুষেরা হাট বাজারে, স্কুল কলেজে, মাদ্রাসা মসজিদে নৈতিকতার শিক্ষা পায়না, নারীপুরুষের সমতার শিক্ষা পায় না। সে কারণে তারা নারীধর্ষণে দ্বিধা করে না। শিশুধর্ষণে তাদের সুবিধে কারণ শিশুরা শক্তি প্রয়োগ করে ধর্ষণে বাধা দিতে পারে না, শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। সে কারণেই বলি, মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শিশুধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না, যতক্ষণ না নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড সর্বত্র বন্ধ না হবে। 

কেউ কেউ বলে পুরুষের যৌনতাড়না বেশি, সে কারণে পুরুষেরা যৌনতাড়না সংবরণ করতে পারে না, সে কারণে যৌনলালসা  মেটাতে নারীর ওপর,  এমনকী মেয়েশিশুর ওপর, এমনকী ছেলেশিশুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এসব বলে তারা ধর্ষণকে জাস্টিফাই করতে চায়। আমি বলি,  পুরুষের যৌনতাড়নার উদ্রেক হলে হস্তমৈথুন করবে। যতবার খুশি ততবার করবে,  কিন্তু   সম্মতি ছাড়া কাউকে  স্পর্শ করবে না। এই শিক্ষা কিশোর বয়স থেকেই  পুরুষের পাওয়া উচিত। কিন্তু তারা তা পায় না। বরং মগজধোলাই হয় বৈষম্যে ভরপুর  ধর্ম দ্বারা, পুরুষতন্ত্র দ্বারা, যে   ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্র নারীকে ব্যক্তিসত্ত্বা হিসেবে দেখে না। 

শিশুধর্ষণকে শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতি বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে দেখলে সমস্যার শিকড় ধরা যায় না। ক্ষমতার অসমতা, নারীবিদ্বেষ, হিংস্র পুরুষতন্ত্র, টক্সিক মাসক‍্যুলিনিটি , শিশুদের ওপর কর্তৃত্ববোধ—এসবের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে।  যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো পুরুষকে শেখায় নারী ও শিশুকে অধীনস্ত, ভোগ্য বা দুর্বল হিসেবে দেখতে, সেই কাঠামোকেই প্রশ্ন করা জরুরি। কেবল মৃত্যুদণ্ড নয়, দরকার সমতা, নৈতিক শিক্ষা, যৌনতা ও সম্মতি বিষয়ে শিক্ষা, এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী জয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *