সৃষ্টিকর্তার ধারণা: আকাশ থেকে নেমে আসা সত্য, নাকি মানুষের তৈরি প্রতিচ্ছবি?

JANUARY 12, 2020

সন্ধ্যা নামার একটু আগে ফোন স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটি ছোট স্ট্যাটাস চোখে পড়ল। খুব সাদামাটা লেখা, কোনো চটকদার ভাষা নেই, তবু বাক্যটি মাথার ভেতর গিয়ে ধাক্কা দিল:

“মানুষই সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে। তাই তো পৃথিবীতে হাজারো সৃষ্টিকর্তা।”

প্রথমে বাক্যটি একটু উল্টো মনে হয়। কারণ ধর্ম তো সাধারণত বলে, ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এখানে দাবি করা হচ্ছে, মানুষই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে। এই উল্টো দাবির ভেতরেই আছে বড় এক দার্শনিক প্রশ্ন: ঈশ্বর কি সত্যিই মানুষের বাইরে স্বাধীনভাবে থাকা কোনো সত্তা, নাকি মানুষের ভয়, আশা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং কল্পনার তৈরি এক মহাশক্তির ধারণা?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস, ভাষা, ধর্মতত্ত্ব এবং মানুষের সামাজিক বিবর্তনের দিকে তাকালে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়: পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজ তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, ভয়, পরিবেশ, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ঈশ্বর বা দেবতার রূপ তৈরি করেছে।

পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্ম, সম্প্রদায়, লোকবিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আছে। আমরা সাধারণত কয়েকটি বড় ধর্মের নামই বেশি শুনি: ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইহুদি ধর্ম, শিখধর্ম, জৈনধর্ম। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর বাইরে আরও অগণিত বিশ্বাসব্যবস্থা ছিল এবং এখনো আছে।

প্রশ্ন হলো, যদি একজন সর্বজনীন, সর্বশক্তিমান, সব মানুষের একই সৃষ্টিকর্তা থাকেন, তাহলে তাঁর সম্পর্কে ধারণাগুলো এত ভিন্ন কেন?

এক ধর্মে ঈশ্বর নিরাকার। অন্য ধর্মে দেবতার মূর্তি আছে। এক ধর্মে ঈশ্বর এক ও অবিভাজ্য। অন্য ধর্মে দেবদেবীর সংখ্যা অনেক। এক ধর্মে পুনর্জন্ম আছে। অন্য ধর্মে একবার মৃত্যু, তারপর বিচার, তারপর স্বর্গ বা নরক। এক ধর্মে শূকরের মাংস নিষিদ্ধ। অন্য সমাজে সেটি উৎসবের খাবার। এক ধর্মে ঈশ্বর পিতা, অন্য ধর্মে তিনি প্রভু, আবার অন্য কোনো বিশ্বাসে দেবী মা, বজ্রদেব, নদীদেবী, বনদেবী অথবা সূর্যদেব।

শুধু নাম আলাদা হওয়াই বড় বিষয় নয়। কারণ একই জিনিসের বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নাম থাকতেই পারে। সূর্যকে ইংরেজিতে Sun, ফিনিশে Aurinko, বাংলায় সূর্য বলা হয়। নাম আলাদা হলেই বস্তু আলাদা হয় না। কিন্তু ধর্মে সমস্যা শুধু নামের নয়। এখানে ঈশ্বরের চরিত্র, বিধান, পছন্দ, অপছন্দ, নৈতিকতা, মানুষের ভাগ্য, মৃত্যুর পরের জীবন, নারী-পুরুষের ভূমিকা, খাদ্যাভ্যাস এবং মুক্তির পথ পর্যন্ত ভিন্ন।

এই গভীর পার্থক্যই প্রশ্ন তোলে: আমরা কি সত্যিই একই সত্তার কথা বলছি, নাকি প্রত্যেক সমাজ নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ঈশ্বর তৈরি করেছে?

অনেকে বলেন, “সব ধর্ম আসলে একই ঈশ্বরের কথা বলে, শুধু নাম আলাদা।” কথাটি শুনতে সুন্দর। কিন্তু দার্শনিকভাবে এটি খুব সহজ সমাধান নয়।

যদি সব ধর্ম একই ঈশ্বরের কথা বলত, তাহলে অন্তত ঈশ্বরের মৌলিক চরিত্র, নৈতিক বিধান, মানুষের পরিণতি, মুক্তির পথ এবং সত্য-মিথ্যার মানদণ্ডে কিছু মৌলিক মিল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, ধর্মীয় দাবিগুলো প্রায়ই পরস্পরবিরোধী।

এক ধর্মে ঈশ্বর জন্ম নেন না, অন্য ধর্মে ঈশ্বর অবতার নেন। এক ধর্মে মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ, অন্য ধর্মে মূর্তিই উপাসনার কেন্দ্র। এক ধর্মে মুক্তি ঈশ্বরের কৃপায়, অন্য ধর্মে মুক্তি জ্ঞান বা কর্মের মাধ্যমে। এক ধর্মে আত্মা এক জীবনের পরে বিচার পায়, অন্য ধর্মে আত্মা জন্ম থেকে জন্মে ঘোরে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: যদি একজন ঈশ্বর নিজেকে সব মানবসমাজে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন, তাহলে তাঁর সম্পর্কে মানুষের ধারণা এত গভীরভাবে বিপরীত হলো কেন?

এই প্রশ্ন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সরাসরি বাতিল করে না। কিন্তু এটি শক্তভাবে ইঙ্গিত করে যে ধর্মীয় ঈশ্বর-ধারণাগুলো মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা, ভয়, আশা এবং ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

ঈশ্বরকে ছেড়ে দেওয়ার ভয় খুব মানবিক। অনেকেই ভাবেন, “তাহলে তো কেউ আমাকে দেখছে না, কেউ আমার কান্না শুনছে না, কেউ শেষ পর্যন্ত বিচার করবে না।”

এই ভয়কে উপহাস করা উচিত নয়। কারণ ধর্ম শুধু মতবাদ নয়; অনেকের কাছে ধর্ম নিরাপত্তা, পরিচয়, পরিবার, স্মৃতি এবং আশা।

কিন্তু ঈশ্বর না থাকলেও মানুষ একা নয়। আমরা একে অন্যের কাছে দায়ী। আমরা একে অন্যের সাক্ষী। আমরা একে অন্যের সান্ত্বনা। যখন কোনো অদৃশ্য বিচারকের ভয় ছাড়াই একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখনই মানবতা সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

ঈশ্বরের চোখের ভয় ছাড়াই মানুষ ভালো হতে পারে। বরং তখন ভালো কাজের মূল্য আরও বেশি। কারণ তখন সে পুরস্কারের লোভে নয়, শাস্তির ভয়ে নয়, মানুষের জন্য মানুষ হয়ে কাজ করছে।

“মানুষই সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে” কথাটি হয়তো কারও কাছে আঘাতের মতো শোনাবে। কিন্তু এটি শুধু অবিশ্বাসের ঘোষণা নয়; এটি একটি অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ।

ইতিহাস বলে, ঈশ্বরের নাম বদলেছে। সমাজ বদলেছে। ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা বদলেছে। দেবতার চরিত্র বদলেছে। মানুষের নৈতিকতা বদলেছে। কিন্তু মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতা রয়ে গেছে। সেই প্রশ্নই সভ্যতার চালিকাশক্তি।

হয়তো কোনো ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেননি। কিন্তু আমরা এমন এক মানবিক পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারি, যেখানে ভয় নয়, যুক্তি কথা বলবে; ঘৃণা নয়, সহমর্মিতা কাজ করবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, প্রশ্ন ও জ্ঞান পথ দেখাবে।

আপনার ধর্মবিশ্বাস যাই হোক, প্রশ্ন করা পাপ নয়। প্রশ্ন করা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্ষমতা।

কারণ মুক্তির শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ ভয়ে নয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ভাবতে শেখে।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী জয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *