মুসলিম মানস-২য় পর্ব

OCTOBER 29, 2021

কথা হচ্ছিল একজন শিক্ষকের সাথে। তিনি ভীষণ রোজাদার মানুষ। নামাজ এক ওয়াক্তও কামাই করেন না। রমজানে ত্রিশ দিনই রোজা রাখেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম- এত রোজা রেখে, নামাজ পড়ে কি হবে? খামোখা এত কষ্ট করারই বা কি দরকার? তার সেই গতানুগতিক উত্তর যা আমি সবার কাছ থেকেই পেয়ে থাকি তা হলো- পরকালের রাস্তা পরিস্কার করতেই এত নামাজ রোজা. দুনিয়া তো মাত্র দুদিনের জন্য আসল জগত তো সেই পরকাল। কি অদ্ভুত কথা বার্তা! যে জগত কেউ কোন দিন দেখেনি, যাকে কোনভাবেই প্রমান করা যায় না, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সামান্য কোন আভাসও পাওয়া যায় না , একজন শিক্ষিত মুমিন মুসলমান বান্দার কাছে সেটাই হলো আসল জগত আর যে জগতে আমরা দিব্বি চলে ফিরে বেড়াচ্ছি, ভাল ভাবে বেচে থাকার জন্য প্রতি নিয়ত যুদ্ধ করছি সে জগত তার কাছে নিতান্তই মিথ্যা বা ফালতু। আমার মনে হয় একজন মুসলমান ও অমুসলমান এর মধ্যে এটাই সব চাইতে বড় মানসিক তফাৎ। যে কারনে একজন মুসলমান হয় ভয়াবহ রকমের অন্ধ বিশ্বাসী ও বাস্তবতা বর্জিত দৃষ্টি ভঙ্গির অধিকারী যেখানে একজন অমুসলিম হয় যুক্তিবাদী ও বাস্তব মানসিকতার অধিকারী। এ দৃষ্টি ভঙ্গীগত পার্থক্যই আসলে গড়ে দেয় মুসলমান ও অমুসলমান সমাজের আর্থ সামাজিক ভিত্তি। যেখানে মুসলমান জাতির অধিকাংশ মানুষ কল্পিত দোজখের আগুন থেকে বাচার জন্য অহরহ নামাজ রোজা হজ যাকাত এসব বাস্তব জগত বর্জিত বিষয় নিয়ে তার অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকে ঠিক তখনই অমুসলিম জাতির অধিকাংশ লোক তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রানান্ত পরিশ্রম করে যায়। ফলাফলও কিন্তু বাস্তব। পরিনতিতে অমুসলিম সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান, ন্যয়বিচার ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের স্বাধিনতা ও সম অধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নতি সর্ববিষয়ে মুসলমানদের চেয়ে হাজার বছরের চেয়েও বেশী অগ্রগামী। অমুসলিমরা যেখানে রকেটে চড়ে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, মুসলিমরা সেখানে মসজিদ আর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে তাদের লব্ধ সম্পদ ব্যয় করে চলেছে প্রান পনে।

তার সাথে কথা আর একটু বিস্তৃত করলাম ইচ্ছে করেই। বললাম- মুসলমানরা নামাজ রোজা করে তো গরীব আর অনুন্নতই রয়ে গেল। তাহলে লাভ কি হলো?

তার সোজা উত্তর- অমুসলিমরা তাদের জ্ঞান বিজ্ঞান অর্জন করেছে কোরান রিসার্চ করে। বলা বাহুল্য, আমি অনেক্েকই দেখেছি তারা এই ইংরেজী শব্দটাই ব্যবহার করে আর সেটা হলো-রিসার্চ।

-তাই যদি হয়, তাহলে মুসলমানরা সেটা পারল না কেন ? সহজাত প্রশ্ন আমার।

-মুসলমানরা হলো নামে মুসলমান, তারা তাদের ধর্মের আমল ঠিক মতো করে না।

আমি জিজ্ঞেস করি- তাহলে এত মানুষকে দেখি রোজা রাখে, নামাজ পড়ে এরা যথার্থ মুসলমান না ? তাছাড়া অমুসলিমরা তো কোন দিনে রোজাও রাখে না , নামাজও পড়ে না, কোরান হাদিসের বিধি নিষেধও কখনো মেনে চলে না , তাহলে তারা কোন রকম আমল না করেই এত উন্নতি করে বসল কিভাবে ?

তার নিরুদ্বেগ উত্তর- এরা মুসলমান তবে নামে , কামে নয়। তাছাড়া হাদিসে বলা আছে অমুসলিমরা ইহজগতে অনেক উন্নতি করবে।

তার এ ধরনের কথা শুনে আমি হাসব নাকি কাদব তাই ঠিক করতে পারলাম না। তবে বোঝা যাচ্ছে সে নিজেই নামে মুসলমান ও বলাবাহুল্য সে ইসলাম বা কোরান বা হাদিস কি তা মোটেই জানে না। পড়ে দেখারও দরকার বোধ করেনি কোন দিন। তাই আসলে যথার্থ মুসলমান যে কারা সে সম্পর্কে তারও ধারনা পরিষ্কার নয়।

আমি আবার জিজ্ঞেস করি- তাহলে কামের মুসলমান কারা ?

তার উত্তর-যারা নবীজির আদর্শ ও উপদেশ এবং কোরান পুর্ন ভাবে মেনে চলে তারাই হলো কামের মুসলমান।

আমি একটু উস্কে দেয়ার জন্য তাকে বলি- তাই যদি হয়, তাহলে একজন মুসলমানকে ১৩/১৪ টা বিয়ে করতে হবে ও তার মধ্যে কয়েকটা আবার দুগ্ধ পোষ্য মেয়ে শিশুকে বিয়ে করতে হবে যেমন নবীজি করেছিলেন আয়শাকে তার ৬ বছর বয়েসে, যখন তখন বিয়ে করে আবার তাদেরকে তালাকও দিয়ে দিতে হবে যা নবীজি করেছিলেন, যারা মুসলমান না যদি তারা দুর্বল হয়, তাহলে তাদেরকে আতর্কিতে আক্রমন করে পুরুষ মানুষগুলোকে সব হত্যা করে তাদের যুবতী নারীদেরকে গনিমতের মাল হিসাবে ভোগ করতে হবে যা নবীজি করেছিলেন যা তিনি করেছিলেন বিনা উস্কানিতে ইহুদি অধ্যুষিত খায়বার আক্রমন করে, কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলতে হবে যা নবীজি করেছিলেন, দুর্বল ও অমুসলিম মম্প্রদায়ের বানিজ্য কাফেলাতে হঠাৎ করে আক্রমন করে তাদের সব সম্পদ লুঠ করে ভাগাভাগি করে নিতে হবে যা নবীজি করেছিলেন ওহুদের যুদ্ধের মাধ্যমে, কোরানের বানী অনুযায়ী একজন সাচ্চা মুসরমান স্ত্রীকে যখন তখন সামান্য কারনে তালাক দিয়ে দেবে বা তাকে মারধোর করবে, যারা মুসলমান না তাদেরকে ঘৃনা করতে হবে, পারলে তাদেরকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই আক্রমন করে হত্যা করে ফেলতে হবে। এতগুলো কথা বলে আমি তাকে মুক্তমনা সাইটের কিছু লেখা দেখানোর চেষ্ট্ াকরলাম।

এবার তার প্রতিক্রিয়া হলো দেখার মত। সর্বপ্রথমেই বলল- আপনি ইহুদি নাসারাদের কিছু ওয়েব সাইট থেকে এসব কথা বলছেন , কোরান বা হাদিস ভাল করে পড়েন নি। ইহুদি নাসারারা বর্তমানে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, দুনিয়া থেকে ইসলাম উৎখাত করার পায়তারা করছে আর তারাই বর্তমানে নানা ওয়েব সাইট খুলে এ ধরনের অপপ্রচার করছে।

সে আরও বলল- একমাত্র ইসলামই নারীদেরকে পূর্ন মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে। তার গলায় সেই গতানুগতিক সুর।

আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম- নারীকে যে বিপুল সম্মান দিয়েছে ইসলাম কোরান হাদিস ঘেটে তার কোন উদ্ধৃতি দিতে পারবেন ? তাকে আরও জিজ্ঞেস করলাম , আপনি নিজে কোরান মাতৃভাষায় পড়েছেন কখনো গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত?

এবার সে বেশ ফাপরে পড়ে গেল। বলাবাহুল্য সেও অন্য ৯৯% মুসলমানের মত কোরান মাতৃভাষায় মোটেই পড়েনি। তাই কোন উদ্ধৃতি দিতে না পেরে বলল- ইসলামে মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেস্ত লুকিয়ে আছে একথা বলেছে। এটা বলে নারীকে বিপুল সম্মান প্রদর্শন করেছে।

সাথে সাথে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম- দুনিয়ায় এমন কোন ধর্ম আছে যেখানে সন্তানের কাছে তার মাকে অসম্মান বা অশ্রদ্ধা করতে বলা হয়েছে? শুধু সভ্য জগত কেন এমন কোন অসভ্য বা আধা সভ্য সমাজ আছে যেখানে সন্তানকে বলা হয়েছে তার মাকে অসম্মান বা অশ্রদ্ধা করতে? সকল ধর্মেই সন্তানকে বলা হয়েছে তার মা তথা পিতা মাতাকে চুড়ান্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে , হিন্দু সনাতন ধর্মে তো পিতা মাতাকে দেবতা জ্ঞানে পূজো করতে বলা হয়েছে। তার মানে হিন্দু সমাজে দেখা যাচ্ছে , মুসলমানদের চাইতেও নারীদেরকে অনেক বেশী সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে বলা হয়েছে। এই যদি হয় অবস্থা সেখানে ইসলামের আর বিশেষ বিশেষত্ব কি থাকল ? আর তা ছাড়া নারী ও পুরুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয়, মায়ের সাথে তার সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, সেটা নির্ধারিত হয় একজন নারীর সাথে তার জীবন সঙ্গী তথা স্বামীর সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। এ বিষয়ে কোরান হাদিস কি বলেছে সেটা পারলে বলেন।

তখন আমি তাকে কোরানের বেশ কতকগুলি বহুল প্রচলিত আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখালাম যেখানে বলা হয়েছে একজন পুরুষ চারটা বিয়ে করতে পারবে, স্বামী তার স্ত্রীকে যে কোন সময় স্ত্রীর অমতেও তালাক দিতে পারবে, স্ত্রীকে সামান্য কারনে মারধর করতে পারবে, স্বাক্ষীর ক্ষেত্রে একজন পুরুষের সমান দুইজন স্ত্রী লোক, স্ত্রী হলো শস্যক্ষেত্র আর তাকে যখন খুশী ভোগ করার একচ্ছত্র অধিকার স্বামীকে দেয়া হয়েছে এসব। কিন্তু কে শোনে কার কথা, তার ঐ এক কথা আরও ভাল করে কোরান পড়ার উপদেশ যদিও সে নিজেই কখনো তা পড়েনি ভাল করে। আর বলাবাহুল্য এর পর আর কথা বাড়ে না।

এর পর সে এ বিষয়ে আর কথা বাড়াতে নিষেধ করল। বলল সে আর এ বিষয়ে কথা বলতে চায় না। এ হলো মুসলিম মানসের বাস্তব রূপ। যখন তর্কে পারবে না তখন সে নিজের পরাজয় স্বীকার না করে চুপ করে যাবে। আর বলবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার কথা কোরানে বলা আছে , তাই সে আর এ বিষয়ে কথা বলতে চাইবে না কিন্তু তারা এটাও জানে না , ধর্ম নিয়ে জবরদস্তি না করার যে কথা কোরানে বলা হয়েছে তা মোহাম্মদ বলেছিল যখন সে মক্কাতে ভীষণ ভাবে দুর্বল ছিল, তার কোন অনুসারী ছিল না , আর তাই তার মুখ থেকে ও ধরনের শান্তির বানী নিসৃত হয়েছিল। সেই মোহাম্মদ যখন মদিনাতে একটা লুটেরা বাহিনী গঠন করে তার সর্দার হয়ে বেশ শক্তি সঞ্চয় করে বসল তখন মোহাম্মদের মূখ থেকে রাতারাতি শান্তির বানী উধাও হয়ে গেল। তখন তার মুখে খালি খুন খারাবির কথা, হত্যা, লুন্ঠনের কথা। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমানই আবার এসব ঘটনাকে সঠিক বা ন্যয় সঙ্গত বলে বিশ্বাস করে। হাদিসে ঘটনাগুলোকে এমন ভাবে বর্ননা করা হয়েছে যেন মোহাম্মদ এগুলো মহান কোন দায়িত্ব পালনের জন্য করেছিল আর সেভাবেই প্রতিটি মুসলমান শৈশব থেকে জেনে এসেছে। ফলে এখন যতই ভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করা হোক না কেন বাস্তব নিরিখে তা তাদের কাছে গ্রহনযোগ্য হয় না।

বলাবাহুল্য আমার পরিচিত এ শিক্ষক কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে দারুন বন্ধুবৎসল, উদারমনা ও মিশুক। হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান এদের মধ্যে কোনই পার্থক্য করেন না। সবার সাথে সমান ভাবে মেশেন । অনেকটা বলা যায় তথাকথিত মডারেট মুসলমান। আর তার এ মডারেট হবার মূল কারন হলো ইসলাম সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকা। তার যদি সত্যিকার অর্থে কোরান হাদিস বর্নিত ইসলামী জ্ঞান থাকত তাহলে তিনি কোনমতেই মডারেট মুসলমান হতে পারতেন না।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *