ইসলামে বর্বরতা 

MAY 16, 2019

ইসলামের অধীনে ক্রীতদাসদের আইনগত কোনোই অধিকার নেই; তারা কেবল একটা ‘বস্তু’ হিসেবে বিবেচিত − তাদের প্রভুদের সম্পদ, যা তারা খেয়াল-খুশিমতো ব্যবহার করতে বা ফেলে দিতে পারে − বিক্রি কিংবা উপহার হিসেবে ইত্যাদি। ক্রীতদাসরা অভিভাবক বা আদালতে সাক্ষী হতে পারে না, এবং তারা যা আয় করবে তা হবে প্রভুর। অমুসলিম ক্রীতদাসদের ইসলামে ধর্মান্তরণও তাকে সরাসরি মুক্ত করবে না। মালিকের জন্য কোনো নারী বা পুরুষ ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।[৯৩]

নিচে দেখা যাবে যে, শরীয়া আইনে ক্রীতদাসরা সাধারণ সম্পদ ও পণ্যের মধ্যে তালিকাভুক্ত এবং তাদেরকে বিক্রির জন্য বাণিজ্য-আইন ধারার নিয়ম-কানুন ও নির্দেশনা। ক্রীতদাসকে কেনার পর ক্রেতা-মালিক তার মধ্যে কোনোরকম খুঁত খুঁজে পেলে সে মালিক তাকে প্রহার করতে পারে, শরীরে দৃশ্যমান কোনো ক্ষত অথবা দাগ সৃষ্টি না করে। ‘ফতোয়া-ই আলমগীরি’ মোতবেক, প্রহার ও নির্যাতনের পর ক্রীতদাসের শরীরে যদি কোনো স্থায়ী দাগ না পড়ে, তাহলে ক্রেতা-মালিক পূর্ণ ক্ষতিপূরণসহ সে ক্রীতদাসকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দিতে পারে। দ্বাদশ শতাব্দে রচিত হানাফী আইনের সারসংক্ষেপ ‘হেদাইয়াহ্’ গ্রন্থটি আমাদেরকে তথ্য দেয় যে, মুসলিম সমাজে ‘চুরির দায়ে ক্রীতদাসদের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করা আইন দ্বারা স্বীকৃত একটি সাধারণ নিয়ম ছিল।’ ইসলাম যদিও ক্রীতদাসদের প্রতি ভাল আচরণ করার কথা বলেছে, তবুও মালিক তার ক্রীতদাসকে হত্যা করলে সেটা ইসলামে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত।[৯৪]

অবিশ্বাসীদের উপর দখলকারী আক্রমণগুলোতে মুসলিম ধর্মযোদ্ধারা প্রায়শই অস্ত্রবহনে সক্ষম বয়সী সকল পুরুষ-বন্দিকে হত্যা করেছে (কেননা তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে হুমকি সৃষ্টি করতে পারতো) এবং ক্রীতদাস বানিয়েছে সকল নারী-শিশুকে, যাদেরকে স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম গ্রহণ করতে হয়েছে। বন্দিদেরকে হত্যা সম্পর্কে হেদাইয়াহ্ বলেছে: ‘বন্দিদেরকে হত্যার ক্ষেত্রে ইমামের (শাসকের) ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে, কেননা নবি বন্দিদেরকে হত্যা করতেন, এবং তাদেরকে হত্যা তাদের অপকর্ম বা পাপের সমাপ্তি ঘটায়।’ হেদাইয়াহ্ বলে যে, নারী ও শিশু বন্দিরা, যারা কোনো হুমকি নয়, তাদেরকে সাধারণত ক্রীতদাস করা হবে, ‘কেননা তাদেরকে ক্রীতদাসকরণ (ইসলামে ধর্মান্তরের জন্যে) তাদের অপকর্মের সুযোগ নিরাময় করে এবং সে সাথে মুসলিমরা একটা সুবিধা অর্জন করে (তাদের শ্রম শোষণ ও মুসলিম সংখ্যা বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে)’।[৯৫] বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন (মৃত্যু ১৪০৬), যিনি অনেক পশ্চিমা পণ্ডিতদের দ্বারাও উচ্চ প্রশংসিত,[৯৬] তিনি মুসলিম বিশ্বে চলমান ক্রীতদাসকরণ পেশাকে ধর্মীয় গৌরবের সাথে বর্ণনা করতঃ লিখেছেন: ‘(বন্দিদেরকে) ‘যুদ্ধের ঘর’ (অমুসলিম বিশ্ব) থেকে ‘ইসলামের ঘর’-এ (মুসলিম বিশ্বে) এনে দাসপ্রথা আইনের অধীনে রাখা হয়, যা স্বর্গীয় তত্ত্বাবধানের মধ্যেই নিহিত; দাসকরণের মাধ্যমে আরোগ্যলাভ করে তারা অত্যন্ত দৃঢ়সংকল্প পাকা বিশ্বাসী হয়ে মুসলিম ধর্মে প্রবেশ করে।’[৯৭] ১১৯৪ সালে বখতিয়ার খিলজির কল (আলিগড়) বিধ্বস্ত করার সময় বন্দিদের মধ্যে যারা ‘জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান’ ছিল, তারা ধর্মান্তরিত হয়; কিন্তু যারা স্বধর্ম আঁকড়ে থাকে, তাদেরকে হত্যা করা হয় (পূর্বে উল্লেখিত)। এখানে তাদেরকে ‘জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান’ বলা হয়েছে, যারা তরবারির ভয়ে দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে ক্রীতদাসত্ব বরণ করে নিয়েছিল। ‘হেদাইয়াহ্’ বলে যে, কোনো যুদ্ধ-বন্দি যদি মুসলিম হয়ে যায়, তথাপি ‘তিনি (ইমাম বা শাসক) তাকে আইনসঙ্গতভাবেই ক্রীতদাস বানাতে পারেন, কেননা ক্রীতদাসকরণের কারণ (অর্থাৎ তার অবিশ্বাসী হওয়া) তাদের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল (যুদ্ধ-বন্দি তথা ক্রীতদাস হওয়ার মাধ্যমে)। আটক হওয়ার পূর্বে কোনো অবিশ্বাসী মুসলিম হয়ে গেলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার (অর্থাৎ তাকে ক্রীতদাস করা যাবেনা)।

ক্রীতদাসদের দুঃখ-দুর্দশা ও ভোগান্তি

অন্যথায় মর্যাদা-সম্পন্ন স্বাধীন মানুষকে গৃহপালিত পশুর মত বোবা-কালা জন্তুতে পরিণত করা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা, যা তার মর্যাদা ও আত্ম-সম্মান বোধও হরণ করে। তদুপরি মুসলিম বন্দিকারীরা সাধারণত বন্দিদেরকে প্রকাশ্যে চৌরাস্তার মোড়ে কুচকাওয়াজ করানোর মাধ্যমে উপহাস, বিদ্রূপ ও অমর্যাদার পাত্র বানাতো। উদাহরণস্বরূপ, সুলতান মাহমুদ কাবুলের হিন্দু রাজা জয়পালকে ক্রীতদাস করে গজনীতে নিয়ে যান এবং জনসমক্ষে তাঁকে চরম অসম্মানিত করেন। ক্রীতদাস বাজারে যেখানে তাঁকে সাধারণ ক্রীতদাসের মত নিলামে তোলা হয়েছিল, সেখানে তাঁকে ‘প্রকাশ্যে প্যারেড করানো হয়, যাতে তাঁর বন্দি সন্তান ও পরাজিত সেনাধ্যক্ষরা এ রকম লজ্জাজনক, বন্দি ও অমর্যাদাকর অবস্থায় তাঁকে দেখতে পায়; সাধারণ ক্রীতদাসের সঙ্গে একত্রে মিশিয়ে তাঁকে জনসমক্ষে অমর্যাদার পাত্র করা হয়।’[৯৯] এরূপ চরম অমর্যাদায় বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে তিনি আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

ইসলামি কর্তৃত্বের শেষকাল পর্যন্তও সর্বত্র ক্রীতদাসদের একইরকম, এমনকি তার চেয়েও খারাপ, ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *