অস্ত্র যেখানে যুক্তির বিকল্প

MARCH 12, 2026

এক
কোন লাভ নেই। হাজার যুক্তি, হাজার তর্কবিতর্ক, কোনকিছুই তাদের কানে যাবে না। যত বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রমাণই দাঁড় করান আপনি কিছুই শুনতে রাজি হবে না তারা। বিশ্বাসের বিপক্ষে যুক্তির আশ্রয় নিতে চাইলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে আপনার ওপর। দোষ খুঁজবে আপনার ‘পশ্চিমপ্রীতি’র। ‘ইহুদীপ্রেমিক’ বলে গুজব রটাবে আপনার বিরুদ্ধে। কালক্রমে ওরা আপনাকে একঘরে করে ফেলবে, কিম্বা একেবারেই গৃহচ্যুত। তাহলে কেন এই মিছিমিছি সময় নষ্ট করা। আমার-আপনার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্মটির কোনও সংস্কার কি কখনো সম্ভব? ‘সংস্কার’ শব্দটিই তো ভয়ঙ্কর ভীতিকর ওদের কাছে—-এতে তারা পশ্চিমের গন্ধ পায়, পায় ইহুদী চক্রান্তের আভাস। এ-ধর্মে প্রশ্নের স্থান নেই, কৌতূহলের প্রশ্রয় নেই। প্রশ্ন বলতে ওরা বোঝে কত রাকাত নামাজ পড়লে কত সোয়াব হবে, অজুর পানি না থাকলে কি করা উচিত, প্রস্রাব-পায়খানা করার পর উত্তমভাবে গাত্র ধৌত করতে না পারাটি কি কবিরা গুণাহ, না, লঘুতর কোনও অপরাধ বলে গণ্য হবে হাসরের দিন! রাত্রিবেলা স্ত্রীসঙ্গ উপভোগ করার পর তৎক্ষণাৎ গোছল করা কি সুন্নত না নফল? আমাদের ধর্মীয় কালচারে এগুলোর নাম প্রশ্ন! কিন্তু আপনি যদি ভুল করেও প্রশ্ন তুলেছেন ‘সৃষ্টিকর্তার’ অস্তিত্ব নিয়ে, এবং তার চেয়েও গর্হিত অপরাধ যদি হজরত মোহম্মদ(দঃ) এর চারিত্রিক বিষয়াদি নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তাহলে সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর সূর্যোদয় দেখবার সৌভাগ্য না’ও হতে পারে আপনার। অতিভাগ্যে যদি প্রাতঃভ্রমণের উদ্দেশ্যে ঘরের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেও, বাড়ি ফেরার সময় আপনার স্কন্ধদেশে মুণ্ডখানা ঠিক আগের জায়গায় থাকবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এই হল আমাদের ধর্মের ‘সহনশীলতা’। একটা কথা ওরা আসলে ঠিকই বলে—-যুক্তি, মুক্তমন, মুক্তচিন্তা, প্রশ্ন, সহনশীলতা, এগুলো মূলত পশ্চিমেরই উদ্ভাবন। ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’ এগুলো সবই ইহুদী চক্রান্ত ইসলামের মহান বাণীকে অপদস্ত করার লক্ষে। ওদের ইহুদীবিদ্বেষ নেহাত অকারণে নয়।

আমাদের ধর্মে মৌলিক প্রশ্নের একটাই জবাব—-তলোয়ার। ইস্পাতের তলোয়ার যদি ব্যবহার না’ও হয়, রসনার তলোয়ার তো অবশ্যই হবে। চারদিকে জানাজানি হয়ে যাবে আপনি নাস্তিক, আপনি শয়তানের দোসর, ইসলামের শত্রু, আপনি ভয়ানক খারাপ লোক। তখন আপনার কোন বন্ধুবান্ধব থাকবে না, আপনার আত্নীয়স্বজনরা আপনাকে এড়িয়ে চলবে, আপনার স্ত্রীর ওপর চাপ পড়বে আপনার শয্যা বর্জন করতে, আপনার ছেলেমেয়েরা পদে পদে লাঞ্ছিত হবে স্কুলে, খেলার মাঠে, বাজারে, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে। যদিনা আপনি জন্মগ্রহণ করেন পাকিস্তান, বা এরকম কোনও মধ্যযুগীয়, মানবধর্মহীন ধর্মীয় রাষ্ট্রে, যেখানে আপনার শাস্তি হবে আরো গুরুতর—-আইনের জোরেই তারা আপনাকে ফাঁসিকাষ্ঠে দাঁড় করাবে। অথবা আপনার গলা কাটবে প্রকাশ্য বারান্দায়, কৌতূহলী জনতার করতালি ও হর্ষধ্বনিমুখর আবহাওয়াতে।

ওদের মাঝে যে উদারমনা, দয়ামায়াশীল ভালোমানুষ নেই তা নয়। ধর্মের এই অনতিপ্রচ্ছন্ন নিষ্ঠুরতাগুলো অবশ্যই ওদের দৃষ্টি এড়ায় না। কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে ওরা একবাক্যে সাফাই গাইবেঃ না না, দোষটা ধর্মের নয়, দোষ মানুষের। মানুষই তার বিকৃত ব্যাখ্যা তৈরি করেছে নিজেদের স্বার্থে। সব মোল্লাদের কাজ। যেন বিকৃত ব্যাখ্যাটির দায়িত্ব মোল্লাদের, আর প্রকৃত ব্যাখ্যার ন্যায্য দাবিদার কেবল তাঁরাই। আসল ব্যাপারটা এই যে ধর্মের কোনকিছুই তাঁরা জানেন না—-মোল্লা-অমোল্লা কেউ না। সবই শোনা কথা। কোরান যারা পড়েছেন তারা এর ভাষা বোঝেন না। যারা ভাষা বোঝেন তারা নিজেদের সুবিধামত ওটার ব্যাখ্যা করে নেন। যদিও পবিত্র কোরানেই স্পষ্ট করে বলা আছে যে এ-গ্রন্থটিতে দু’প্রকারের বাণী —-একটি সর্বজনবোধ্য, আরেকটি সম্পূর্ণ বোধাতীত, আকারে ইঙ্গিতে এমনভাবে গ্রন্থিত যা বুঝবার ক্ষমতা এক আল্লাপাক ছাড়া অন্য কারও নেই (৩ঃ৭, প্রিকথল)। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে এ আয়াতটির অর্থে কোনও দ্ব্যর্থতার অবকাশ নেই—-অতীব পরিষ্কার। সাদা আর কালো। দুয়ের মাঝামাঝি কোনও ‘কিন্তু-যদি’র ফাঁক নেই। অতএব কেউ যেন না বলেন আমাকে যে ধর্মের একটা ব্যাখ্যা সাধু-সন্ন্যাসীর, আরেকটা খুনি-জল্লাদের। পথের ফকির থেকে সিংহাসনে উপবিষ্ট পরাক্রান্ত সম্রাট, উভয়ের জন্য একই বাণী একইভাবে বোধ্য-দুর্বোধ্য আঙ্গিকে লেখা। এই একটি বিষয়ে আমার পিতৃদত্ত ধর্মটি আমার পছন্দের। এতে কোনও দ্ব্যর্থতা নেই—-ছোটবড় ভেদাভেদ নেই। সব সমান আল্লার চোখে। সমস্যা সেখানে নয়, সমস্যা হল দ্ব্যর্থতাহীন বাণীগুলোর বক্তব্যটিতে। এই বক্তব্যের কারণেই তো জিহাদিরা জিহাদ ছাড়া আর কিছু উচ্চারণ করতে পারে না, জল্লাদরা সবসময় তলোয়ার নিয়ে তৈরি কারো-না-কারো কল্লা কাটার জন্যে। আমাদের ‘উদারমনা’ ভালোমানুষ ইমানদাররা যখন দাবি করেন যে জিহাদ আর তলোয়ার প্রকৃত ধর্মের বাণী নয়, তখন ধর্ম সম্বন্ধে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা কি অযৌক্তিক? সত্যিকার অর্থে তারা ধর্মের কিছুই জানেন না। জানেন না বলেই ছোটবেলার মগজ-ধোলাই-করা বিশ্বাসগুলো আজীবন অক্ষুণ্ন থেকে যায় তাদের মস্তিষ্কে—-ধর্মবিষয়ে কখনও কোনও প্রশ্ন তোলার কল্পনাই তাদের মাথায় ঢোকে না। তারা চোখ বন্ধ করে সব মেনে নেন, এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই বন্ধ চোখের পাতা খুলে বাইরের জগতটি কিঞ্চিৎ স্বচক্ষে অবলোকন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না। সেকারণেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ধর্মবিশ্বাস মানেই অন্ধবিশ্বাস—-এই বিশ্বাসের অন্ধ আর অনন্ধ বলে কোনও ভাগাভাগি নেই।

অহি-বাহিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহের প্রতিটি বাক্যবাণীতে যাদের গভীর আস্থা, তাদের ধারণা যে আমরা যারা সন্দেহপরায়ন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি, তারা নাস্তিক, তাদের মন শয়তানের প্রভাব দ্বারা কলুষিত, তারা অবিশ্বাসী। প্রথমত আমি শয়তানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করিনা যেমন করি না ঈশ্বর নামক কোনও অতিপ্রাকৃত সত্ত্বার অস্তিত্বে—-ঈশ্বর আর শয়তান আমার দৃষ্টিতে একই নাটকের দুটি বিপরীত চরিত্র, ইংরেজিতে যাকে বলে প্রটাগনিস্ট এবং এন্টাগনিস্ট—-বলিউডের বোম্বেটে ভাষায় বাহাদুর আর দুশমন। দুটিরই দরকার জনপ্রিয় নাটকের জন্যে। দ্বিতীয়ত, আমার বিশ্বাস বলে কিছু নেই এটা আমি মানতে রাজি নই। অবশ্যই আছে। অনেক কষ্ট করে, অনেক সাধ্য-সাধনা করে এটি অর্জন করতে হয়েছে আমকে। পার্থক্যটা হল যে আমার বিশ্বাস কারো অর্পিত বিশ্বাস নয়, নিজেরই শ্রমার্জিত বিশ্বাস। এবিশ্বাস অন্ধ নয়, এবিশ্বাস বিবর্তনের ধারাতে আস্থাবান, সময়ের অনুগামী, বিজ্ঞানের আজ্ঞাবহ, জ্ঞানচর্চায় নিত্য নিয়োজিত। এতে অন্ধত্বের অবকাশ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

অনেকের ধারণা দারিদ্র্য আর অশিক্ষা-কুশিক্ষাই প্রধানত ধর্মীয় অন্ধত্ব আর গোঁড়ামির আকর। হ্যাঁ, দারিদ্র্য একটা আরামদায়ক আবাসস্থল বটে গোঁড়ামির, এবং এই আরামের পরিবেশেই ধর্মীয় উন্মাদনা অনেকসময় ভয়াবহ আকার ধারণ করে, অনেকটা বৃষ্টিহীন খরা অরণ্যে দাবানলের আগ্রাসী রূপ ধারণ করার মত। গুবরে পোকা আর গুমাছিরা যেমন পঁচাডোবা আবর্জনা পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে, ধর্মও তেমনি দারিদ্র্যের কাদামাটিতে নবজীবনের প্রাবল্য অর্জন করে—ধর্মের বিস্তার ও সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে দারিদ্র্য নামক পুষ্টিকর খাদ্যটির অবশ্যই প্রয়োজন। তবে ধর্ম কেবল দরিদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে তার কোনও অর্থ নেই। অতি উচ্চশিক্ষালব্ধ, শ্বেতমার্বেল নির্মিত প্রাসাদবাসীরাও এর জাদুকরি প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না সবসময়। এমনই এক অব্যর্থ নেশাকর এই ধর্ম নামক দ্রব্যটি যে একবার তাতে আসক্ত হতে পারলে সহজে তার কবল থেকে কারও মুক্তি নেই। অনেকটা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের দুঃখকষ্টহীন নষ্ট ছেলেমেয়েদের ড্রাগাসক্তির মত।
আসলে ধর্মের আঙ্গিনাতে ছোটবড়, ধনীগরিব আর বকলম-সকলমের খুব একটা তফাৎ নেই। আমি অনেক অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মানুষ দেখেছি, ধর্মবিষয়ে তারা প্রচণ্ডরকম কৌতূহলী, এমনকি সংশয়বিদ্ধ, আবার এমন অনেক উচ্চশিক্ষিত, আপাতপণ্ডিত ব্যক্তিও দেখেছি যারা একটু বয়স হলেই তসবি ছাড়া রাস্তায় বের হবার ভরসা পান না, এবং কার্যত মসজিদের সতরঞ্চিতেই অতিবাহিত হয় তাদের অধিকাংশ সময়। তারা সর্বক্ষণই উচারণ করে যাচ্ছেন আল্লারসূলের জিকির। পশ্চিম জগতে কোনও বড় গবেষণার খবর তাদের কানে আসা মাত্র কোরান খুলে বসেন কোন সুরাতে সেই গবেষণাটির সংকেত রয়েছে। নিজেরা আবিষ্কার করতে সক্ষম না হলে বিজ্ঞজনদের ঘোষণার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহ সহকারে বসে থাকেন কখন ‘প্রমাণ হবে’ যে এটি আল্লাপাকের কোরানেই ছিল বরাবর। অর্থাৎ নাসারা-ইহুদী বিজ্ঞানীরা নতুন কিছুই আবিষ্কার করেনি কখনও। সব জ্ঞানের উৎস তো পবিত্র কোরা্নই!
শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয় প্রকার বিশ্বাসীদের একটা জিনিস ভীষণ প্রিয়—–অলৌকিকতা। অতিপ্রাকৃত যে-কোন ঘটনা, বাস্তব বা কাল্পনিক তাতে কিছু আসে যায় না, অনায়াসে সম্মোহিত করে তাদের। করে বলেই কুমারী যুবতীর গর্ভে সন্তান আগমনের সংবাদ তাদের সন্দিহান করা দূরে থাক, ভক্তিরসের প্লাবনধারায় আপ্লুত করে তোলে। এই এক অদ্ভুত মানসিকতা আমাদের, সাধারণ গুজবকে অগ্রাহ্য করতে হয়ত দ্বিধা করব না, কিন্তু গুজবটি একটু অসাধারণ হয়ে গেলে, অর্থাৎ অলৌকিকতার মাত্রায় পৌঁছে গেলে, তৎক্ষণাৎ আমরা পোষা কুকুরের মত প্রভুর পদতলে বসে চুপ করে শুনব সেটা। অনেকটা এই কারণেই ধর্মপ্রচারকদের একশ ভাগের একশ ভাগই বলতে গেলে অলৌকিকের আশ্রয় নিয়েছেন। মহাপ্রভু যীশুর একান্তই প্রয়োজন ছিল কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করা। হজরত মুসাও প্রয়োজনের খাতিরেই সমূর্ত ঈশ্বরের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন সুউচ্চ পর্বতপৃষ্ঠে। প্রয়োজন ছিল বলেই তাঁর লাঠির স্পর্শে নীলনদীর পানি আপনা থেকেই প্রশস্ত সড়কের রূপ ধারণ করেছিল। প্রয়োজন না হলে কি হজরত ইব্রাহিম তাঁর আপন পুত্রকে জবাই করার জন্যে পাহাড়ের চূড়াতে নিয়ে যেতেন? নিয়েছিলেন বলে বিশ্বের তিনটে ধর্ম একে অন্যকে ছাড়িয়ে গেল ওই অলৌকিক ঘটনার ওপর আপন স্বত্ব স্থাপন করতে। ওদিকে চির সন্দেহপ্রবন আরব জাতিকে আল্লার নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার লক্ষে মহাকাশের সপ্তস্তরে অবস্থিত সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে অলৌকিক মোলাকাতের অবশ্যই প্রয়োজন ছিল আমাদের মহানবী হজরত মোহম্মদ (দঃ) এর। একটা অলৌকিক কাণ্ডের কি ক্ষমতা জানেন তো? মানে রাতারাতি কয়েক লক্ষ নতুন ভক্ত সৃষ্টি হওয়া। সেই স্বর্গীয় সাক্ষাৎটি এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। এমনই শক্তিশালী এই ‘অলৌকিক’ বিষয়টি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে আমাদের তিনটে মুখ্য ধর্মেরই পবিত্র গ্রন্থগুলোতে অলৌকিকতার জয়গান করা হয়েছে বিপুল জাঁকজমক সহকারে। ক্যাথলিকদের ক্ষেত্রে এটি এখনো বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। ভ্যাটিকেনের পোপ মহাশয় মাঝেমধ্যেই সন্ত পদবী প্রদান করেন ক্যাথলিক চার্চের অতি পুণ্যবান ব্যক্তিদের যার অন্যতম শর্তই হল প্রাপক ব্যক্তিটির দলিলপত্রে অন্তত একটি উল্লেখযোগ্য অলৌকিকতা সাধনের প্রমাণ থাকা চাই!
সেকালের সাধুসন্ন্যাসী আর পীর পয়গম্বরদের একটা সুবিধা ছিল—-আধুনিক বিজ্ঞানের তখন একেবারেই শৈশবাবস্থা। অতিপ্রাকৃতকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে খণ্ডাবার চেষ্টা করবে এমন কোনও ঢালতলোয়ার তার গুদামে ছিল না সেসময়। অলৌকিককে ভূয়া বা ভাওতা বলে উড়িয়ে দেবে সেই বুকের পাটাই বা কার। বরং দুচারটে বিজ্ঞানমনা মানুষ যা’ও উঁকি দিচ্ছিলেন এখানে ওখানে তাঁরা নিজেরাই ‘অলৌকিক’এর মোহে বুঁদ হয়ে ছিলেন। বর্তমান যুগে অবশ্য অলৌকিকবাদীদের ব্যবসায় খানিকটা মন্দা পড়েছে, অনেকটা বিজ্ঞানের আশাতীত সাফল্যের কারণেই। কিন্তু তাই বলে অলৌকিকতা দূর হয়েছে সেরকম দাবি কেউ করতে পারবে না। এখনো ঘরে ঘরে নিত্যনিয়তই অলৌকিক ঘটনা ঘটছে। এবং ঘটবেও। সদ্যজাত গাভীর গাত্রদেশে আরবি হরফে আল্লার হস্তাক্ষর, মুরগির ডিমে আল্লার নাম, পূর্ণিমার চন্দ্রপৃষ্ঠে ইমাম খোমাইনীর নাম পরিষ্কার ফারসি হরফে লেখা, ঢাকার আকাশে পরিষ্কার অক্ষরে লেখা সাদ্দাম হুসেনের নাম, পাথরের গনেশ মূর্তির কৃত্রিম মূত্রনালী দিয়ে টাটকা গোদুগ্ধ নিষ্ক্রমণ, সূর্যাস্তের আকাশে মাতা মেরির মূর্তি দর্শন—-এসব হল আধুনিক অলৌকিক বাজারের খবর। অলৌকিক রোগমুক্তি দুরারোগ্য ব্যাধির কবল থেকে, যীশুখ্রীষ্ঠ যা অহরহই করতেন, এমনকি মৃতকে পুনর্জীবিত করে ফেলা, তা’ও একেবারে অচল হয়ে যায়নি।

ধর্মবাদীদের সবচেয়ে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন চার্লস ডারউইন নামক এক নাসারা ইংরেজ। তাঁর মতানুসারে মানুষ নাকি আদম-হাওয়া থেকে আসেনি, এসেছে শিম্পাঞ্জি আর বানরের বংশ থেকে। ধর্মের মূল ধরে টানাটানি—–ছয় হাজার বছর আগে বিবি হাওয়া আল্লার নিষেধ অমান্য করে হজরত আদমকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করতে প্রলুব্ধ করেছিলেন, সেই অমান্যতার ফসলই আমাদের এই মানবকূল। ধর্মের এই চিরাচরিত বিশ্বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লোকটি প্রচার করতে লেগে গেলেন যে মানুষের বয়স ছয় হাজার বছর তো নয়ই, মানুষ আদৌ মানুষ রূপেই আবির্ভূত হয়নি। হয়েছে ধীরে ধীরে কয়েক লক্ষকোটি বছর ধরে বানরজাতি থেকে বিবর্তিত হয়ে হয়ে। বলে কি লোকটা? এক কথাতেই সৃষ্টিতত্বের ওপর গড়ে ওঠা এত সুন্দর কেচ্ছাটি তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দেওয়া? কত বড় ধৃষ্টতা মানুষটার—–জীবজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ বলে সৃষ্টিকর্তা নিজেই যাকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন, সেই মহান মানবজাতিকে জীবজন্তুর বংশধর বলে ঘোষণা করার উদ্দেশ্যটা কি? অথচ কি অদ্ভুত কাণ্ড, শিক্ষিতদের অধিকাংশই কেতাবের বাণী অগ্রাহ্য করে সেই নাস্তিকটার আজগুবি প্রলাপের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে। তাই মুসলমান যুবকরা যেমন উঠে পড়ে লেগে গেছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সারা বিশ্বব্যাপী, বিশ্ববাসী তা চাক বা না চাক, অমুসলমান শিক্ষিতেরা তেমনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কি করে ‘বিবর্তনবাদ’কে মিথ্যাচার বলে প্রমাণ করা যায় বিজ্ঞানেরই সাহায্যে। তাদের এই মহান প্রচেষ্টায় যথেষ্ট গুণীজ্ঞানী বিজ্ঞানী সহায়তা দিচ্ছেন। পশ্চিমের কোন কোন অঞ্চলে এখনো স্কুলকলেজে বিবর্তনবাদ পড়তে দেওয়া হয় না। খোদ আমেরিকাতে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি বলে নিজেদের দাবি করাতে যাদের জুড়ি নেই, সেখানেও, এই একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল প্রযুক্তিতাড়িত অত্যাধুনিক যুগেও, শতকরা ৪৬ জন নাগরিকের কাছে ‘বিবর্তনবাদ’এর চাইতে বরং বাইবেল-বর্ণিত ‘সৃষ্টিবাদ’ই বেশি গ্রহণযোগ্য। এখনো সাধারণ লোকের মুখে শোনা যায় এমন অদ্ভুত যুক্তি যে তাদের বাপদাদা চোদ্দপুরুষ কেউ বানর ছিলেন বলে জানা নেই, সুতরাং ডারউইন যে মিথ্যাবাদী ছিলেন তার প্রমাণ তো সেখানেই। এই একই যুক্তি আমাদের দেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলের মুখেই অহরহ শুনতে পাই। আমাদের দেশের মোল্লা-মৌলবিরা তো সুযোগ পেলেই এই যুক্তি উত্থাপন করে সুবোধ সুশীল জনগণের মধ্যে হাসির হুল্লোড় সৃষ্টি করেন।

 
আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিতের কাছে যা ‘প্রমাণ’ বলে পরিচিত ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে তার ঠিক এক অর্থ নয়। যদিও সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাতা’লার অস্তিত্ব ব্যাপারে এই দুটি বিপরীত মেরুতে মোটামুটি একটা বোঝাপড়া হয়ে গেছে।। দুদলই মেনে নিয়েছেন যে আল্লা আছেন তার কোনও প্রমাণ যেমন নেই, তেমনি তিনি নেই তারও কোনও সরাসরি প্রমাণ নেই। এটা পুরোপুরিই নিজ নিজ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার।

দুই

ধর্মীয় গোঁড়াদের আমি একটু সমীহ করে চলি। বলা যায় না কখন কিসেতে বারুদের মত জ্বলে ওঠে। ওরা একত্র হলে বিপদের সম্ভাবনা হাজারগুণে বেড়ে যায়। গোঁড়ামি এক জিনিস যার সঙ্গে শিক্ষার খুব একটা সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। শিক্ষিত গোঁড়ারা সাধারণত ছোরা-চাপাতি নিয়ে ঘোরাঘুরি করেনা রাস্তাঘাটে, যেমন করে অশিক্ষিতেরা। ওদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে বড় ক্ষতিটা কিন্তু এই রগচটা চাপাতি-হাঁকানো অশিক্ষিতরা করে না, করে বগলে বইপুস্তক-চাপানো লেখাপড়াজানা গোঁড়ারা। তাঁরা অজ্ঞতা দিয়ে অজ্ঞতা পোষণ করেন না, জ্ঞান দিয়ে করেন। তাঁরা জ্ঞানের মন্ত্র দ্বারা উৎসাহিত করেন বলেই মূর্খের দল চাপাতি নিয়ে রাস্তা টহল দিতে বেরুয়। এই আপাত শিক্ষিত অজ্ঞ নেতাদেরই আমার বড় ভয়।
‘অজ্ঞ’ বলছি বলে ভুল বুঝবেন না যেন আমাকে। এই ‘অজ্ঞ’দের অনেকেই আমার চেয়ে হাজারগুণে বেশি বিদ্বান। বড় বড় পদকপ্রাপ্ত অনেকে। আন্তর্জাতিক শিরোপা-সম্মান দ্বারা ভূষিতও কেউ কেউ। মহা মহা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহা মহা ডিগ্রিপ্রাপ্ত জ্ঞানবীর। দুঃখের বিষয় যে এই মহা মহা পণ্ডিত ব্যক্তিগুলোই বড় ক্ষতিগুলো করেন সাধারণত। জেনেশুনে করেন তা বলছিনা, অজান্তে করেন, এবং সেটা আরো দুঃখজনক।
গত শতাব্দীর কতগুলো সাল ইতিহাসের গায়ে বিশেষ দাগ রেখে গেছে, বিবিধ কারণে। যেমন শুরুতেই, ১৯০০ সাল, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের মাথা থেকে বেরুল কুয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রথম আইডিয়া, যদিও সেসময় তাঁর কোন ধারণাই ছিল না এই আইডিয়াটি কোনও মাথামুণ্ডুহীন উদ্ভট কল্পনা, না সত্যি সত্যি কিছু বস্তু আছে তাতে। উদ্ভট কল্পনা যে মোটেও ছিল না সেটা তার প্রমাণ তো আইনস্টাইনের যুগান্তকারি আবিষ্কার—-বিশেষ আপেক্ষিক তত্ব। বিজ্ঞানজগতে এতবড় বিপ্লব আর ঘটেনি আগে। অনতিকাল পরে এই একই ব্যক্তি নিয়ে এলেন আরো এক বিস্ময়—-সাধারণ আপেক্ষিকতা, বা, অভিকর্ষ তত্ব। অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীর মতে, বিশুদ্ধ নান্দনিকতার বিচারে, এই তত্বের চাইতে মনোগ্রাহী সৃষ্টি আইনস্টাইনের আগে বা পরে কারো কাজের মধ্যে প্রকাশ পায়নি। সব সুন্দরের সেরা সুন্দর তাঁর সমীকরণমালা। সেটা ঘটে ১৯১৬ সালে। ১৯২৮ সালে স্যার আলেকজাণ্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিন আবিষ্কার। চিকিৎসাশাস্ত্রে সে যে কতবড় ঘটনা তার জীবন্ত সাক্ষী তো পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি নাগরিকই। এমন আরো অসংখ্য আবিষ্কার দ্বারা বিংশ শতাব্দীর গৌরবময় অধ্যায়টি স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। বিজ্ঞান আর চিকিৎসাশাস্ত্রে কেবল নয়, জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখাতেই সৃষ্টিশীল মানুষের বলিষ্ঠ পদচিহ্ন দ্বারা ধন্য হয়েছে বিগত শতাব্দী। রাজনৈতিক অঙ্গনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, এডলফ হিটলার নামক এক আসুরিক চরিত্রের উত্থান ও পতন, ইজরায়েলের জন্ম প্যলাস্টাইনের হৃদপিণ্ডের প্রায় মধ্যিখানে, পূর্ব-পশ্চিমের ঠাণ্ডাযুদ্ধ, সোভিয়েট ইউনিয়ানের উত্থান ও পতন ৭২ বছরের ব্যবধানে, সবই বিংশ শতাব্দীরই ঘটনা। এসবের মাঝে একটি সাল আমার দৃষ্টিতে প্রচণ্ড তাৎপর্যপূর্ণ—-১৯৭৯। এই সালেরই প্রথমদিকে ইরানের শাহ পহলবী স্বদেশ ত্যাগ করে নির্বাসনে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন, এবং বছর শেষ না হতেই ইরানের শাসনদণ্ড সর্বতোভাবে হস্তান্তরিত হয় আয়েতুল্লাহ খোমাইনি চালিত শিয়া মতবাদী গোঁড়া মোল্লাতন্ত্রের ওপর। আধুনিক যুগে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নজির এই প্রথম—-ইসলামিক জাতিয়তাবাদী চিন্তাধারাতে এ যে কতবড় উৎসাহ উদ্দীপক একটি ঘটনা সেটা সবাই সমভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন কিনা জানি না। আমার মতে এর একটা সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য আছে।
১৯৭৯ সাল সেখানেই শেষ নয়, শুরুমাত্র। ইরানের মতই ভূকম্পন সৃষ্টিকারি ঘটনা অত্যন্ত নাটকীয়ভাবেই সঙ্ঘটিত হতে শুরু করে পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানে। স্থানীয় শাসনকর্তাদের লোকদেখানো মামুলি আমন্ত্রণে পরাক্রান্ত শক্তি সোভিয়েট ইউনিয়ান তার সৈন্যসামন্ত আর অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আক্রমন চালায় আফগানিস্তানের ওপর। সেই আক্রমনের অশুভ পরিণতি যে শুধু সোভিয়েট ইউনিয়ানকেই ভোগ করতে হয়েছে তাই নয়, সারা বিশ্বই তার মরণ প্যাঁচে জড়িয়ে পড়েছে কোন-না-কোনও ভাবে, সমুদ্রের অক্টোপাস যেমন করে জড়ায় তার পরিপার্শ্বের সকল জীবজন্তু তরুলতাকে। আসলে ১৯৭৯ সাল এখনো শেষ হয়নি, তার দুর্ভোগ হয়ত কয়েক প্রজন্ম ধরেই ভোগ করতে হবে আমাদের।
এ দুটি বড় ঘটনার সমতুল্য না হলেও সেই একই বছর আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে, যা অন্তত আমার চোখে একটা বিশেষ গুরুত্ব ধারণ করে। সেই বছরই ইতিহাসের প্রথম মুসলমান পদার্থবিজ্ঞানীকে নোবেল পুরষ্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয় সুইডেনে। সম্মানিত ব্যক্তিটির নাম অধ্যাপক আব্দুস সালাম—-মুসলিম জগতের কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব, সারা মুসলিম জাহান যার গর্বে গর্বিত। ছোট্ট একটা সমস্যা ছিল যদিও—-তিনি না ছিলেন সুন্নি মুসলমান, না শিয়া। তিনি ছিলেন আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমান। আহমেদিয়াদের বিরুদ্ধে আইন করেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে যে তারা মুসলমান নয়। সে-দুঃখে তিনি দেশত্যাগ করে বিলেতের অক্সফোর্ডে গিয়ে বসবাস স্থাপন করেছিলেন সেসময়, যদিও তাঁর জন্মভূমি পাকিস্তানের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদত সর্বক্ষণ। যাই হোক, আইনত অমুসলমান হওয়া সত্বেও ১৯৭৯ সালে যখন তাঁর নোবেল বিজয়ের খবর বেরিয়ে গেল তখন সারা মুসলিম বিশ্বই আনন্দে আত্মহারা। এমনকি আমার অভাগা দেশ, বাংলাদেশ, যেখানে ‘৭১এর স্মৃতি তখনো টগবগে লাল, সেখানে একজন পাকিস্তানীকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি হবার কথা নয়। কিন্তু হয়েছিল, এবং হওয়া উচিতও ছিল, পাকিস্তানী হওয়া সত্বেও। শত হলেও আমাদের পূর্বাঞ্চলেরই এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, যাঁর সমকক্ষ কৃতিপুরুষ বলতে গোটা উপমহাদেশে তখন সি ভি রমন আর রবিঠাকুর ছাড়া আর কেউ ছিলেন না, তাঁকে নিয়ে গর্ব আমরা অবশ্যই করব। কিন্তু আমাদের দেশে গর্ব করা হয়েছিল তাঁর বিজ্ঞানের জন্য নয়, তাঁর নামটি মুসলমান হওয়ার জন্য। নামে মুসলমান হলেই যথেষ্ঠ আমাদের জন্য, আমরা উলঙ্গ হয়ে নাচতে শুরু করব।
সেবছর পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার সালাম সাহেব একা পাননি, আরো দুজন সহপ্রাপক ছিলেন তাঁর। লি শেল্ডন গ্ল্যাসো, আর স্টিভেন ওয়াইনবার্গ। দুজনই প্রায় সমবয়সী, সালাম সাহেবের চেয়ে প্রায় সাত বছর ছোট, এবং দুজনেরই জন্মস্থান নিউ ইয়র্ক শহর। তিনজন ঠিক একই বিষয়ের ওপর যুগান্তকারি কাজ করে নাম করেছিলেন বিশ্বজোড়া, এমনকি একসঙ্গে কাজও করেছেন কিছুটা সময়। অন্তরংগ বন্ধু হয়ত ছিলেন না তাঁরা, কিন্তু একটা ঘনিষ্ঠ সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্ক ছিল অবশ্যই। প্রভেদ যেটা ছিল সেটা ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ক্ষেত্রে। একজন ছিলেন গোঁড়া মুসলমান—-নিয়মিত নামাজরোজা করা পাক্কা মুসলমান। আর দুজন খাঁটি ইহুদী বংশোদ্ভূত। তার মাঝে গ্ল্যাসো সাহেব হয়ত সনাতন ইহুদী ধারারই অনুসারি, আর স্টিভেন ওয়াইনবার্গ হলেন পাঁড় নাস্তিক। নোবেল পুরষ্কার হাতে নেবার সময় তিনজন তিনরকম ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটা বেশ মজার। ইহুদীদ্বয় প্রচলিত ধারাতে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানবিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন নিজেদের, কিন্তু সালাম সাহেব ওই সুবর্ণ সুযোগ অনর্থক পায়ে ঠেলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। বিসমিল্লাতেই শুরু করলেন এভাবেঃ

কার দৃষ্টিভঙ্গের সঙ্গে আপনার নিজের মতামতের মিল খায় বেশি? নাকি কারও না? প্রফেসার সালাম সারা বিশ্বভুবনে পরম করুনাময়ের অশেষ করুনার বারিধারা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না। তার ঠিক পাশেই বসা, প্রায় একই ধীশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ওয়াইনবার্গ বলছেন অন্য এক জায়গায়ঃ

অর্থাৎ ধর্ম থেকে দূরে থাকতে পারার ব্যাপারটি সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের কারণে, এই প্রাপ্তিটুকুকে কেউ যেন ছোট করে না দেখে, বা কোনক্রমে পিছুপা হয়ে না যায় সেই প্রাপ্তির গৌরব থেকে। ওয়াইনবার্গ সাহেবের অন্যান্য উক্তির সঙ্গে আমি একমত হই বা না হই, অন্তত এই উক্তিটির সঙ্গে আমি একমত না হয়ে পারছিনা। এবং আমার বিশ্বাস, অত্যন্ত উঁচুমানের বিজ্ঞানী হিসেবে প্রফেসার সালাম নিজেও হয়ত কোনও যৌক্তিক ফাঁকফোকড় খুঁজে পেতেন না এতে (দুঃখের বিষয় যে প্রফেসার সালাম মাত্র সত্তুর বছর বয়সে এন্তেকাল করেন, ১৯৯৬ সালে, নিজের পেয়ারা দেশ পাকিস্তান থেকে অনেক দূরে, অক্সফোর্ড শহরে)।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *