JANUARY 10, 2021
ঈশ্বর। এ সত্তাটির প্রতি মানুষের কৌতূহল চিরায়ত। পৃথিবীর বৃহৎ ধর্মগুলো ঈশ্বরকে কেন্দ্রে রেখেই গঠিত। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি বিকশিত হবার অব্যবহিত পরই হয়ত এ সত্তার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। সে কতকাল আগের কথা, এখনো সেভাবেই চলছে। কত উত্থান-পতন হলো মানুষের, কত প্রাণী এল গেল, প্রকৃতি কত বার ভাঙা-গড়ার খেলা খেলল, কিন্তু বিশ্বাসীদের কাছে ঈশ্বর আজও অস্তিমান। কখনোই ঘটেনি তার অস্তিত্বের সংকট। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই এখন একেশ্বরে বিশ্বাসী। তারা উপাসনা করেন তার; যদিও-বা উপাসনার ধরণ ভিন্ন। আবার ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। স্বীকার ও অস্বীকারের মাঝামাঝিও আছেন অনেকে। ঈশ্বরের নামে মানুষ যেমন শৃঙ্খলিত হয়েছে, তেমনি চালিয়েছে নৃশংসতাও। ঈশ্বরের নামে পৈশাচিকতা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।
কিন্তু কে এই ঈশ্বর? কী পরিচয় এই চিরায়ত সত্তার? অধিকাংশ ধর্মশাস্ত্রে ঈশ্বর বিষয়ে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তা ভীষণ রহস্যে আচ্ছাদিত। শাস্ত্রপ্রোক্ত সেই সব ব্যাখ্যা ঘুরানো-পেঁচানো এবং ধোঁয়াশা বলে মনে হয়। তা পাঠান্তে প্রেমের পরিবর্তে তার প্রতি ভয়ের সৃষ্টি হয়। কোনো ধর্মশাস্ত্রই ঠিক এভাবে বলতে পারেনি : এই, ইনিই হচ্ছেন ঈশ্বর। বিভিন্ন দার্শনিক যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে ঈশ্বরকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়েছে, কিন্তু শেষাব্দি ঈশ্বর প্রতিষ্ঠিত হতে হতে আর হয়ে ওঠে না।
আস্তিক-নাস্তিক কিংবা সংশয়বাদী প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বহুবিশ্র“ত ঈশ্বর নামক সত্তাটির সন্ধান করে থাকেন। তাড়িত হন এক কঠিন ভাবনায়। অবিশ্বাসী হতে পারি, কিন্তু আমিও যে ঈশ্বরের সন্ধান করিনি এরকম বলাটা বোধহয় উচিত হবে না। মাঝে মধ্যে শেষ রাতে জানালা খুলে আকাশের দিকে তাকিয়েছি। নক্ষত্রের ফাঁকে দৃষ্টি দিয়েছি কথিত ঈশ্বরকে দেখবো বলে। কৈশোরে পিতার মুখে শুনেছি, শেষ রাতে ঈশ্বর নাকি প্রথম আসমানে নেমে আসেন। শৈশবে শোনা সেই কথাটি এখনো মাঝে মধ্যে রিচুয়্যাল হয়ে ওঠে। কাঁচা মনে যে তা গেঁথে গিয়েছিল! কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলে হঠাৎ ঈশ্বরের কথা স্মরণ হতো। হতে পারে তা ঐতিহ্যগত স্বভাব। আমার পূর্বজ মানুষগণ লক্ষ-কোটি বার ঈশ্বরের নাম জপেছেন। তাদের কাছে শুনতে শুনতে আমারও মনের ভিতর ঈশ্বর নামক একটি সত্তার বিমূর্ত অবয়ব স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিল। তাই বলে অন্ধ-বিশ্বাসী নই আমি। ঈশ্বরকে দেখার জন্য, পাওয়ার জন্য যত রকমের মানবীয় চেষ্টা আছে, সব চেষ্টাই করেছি। কিন্তু তাকে দেখিনি, পাইনি। অবশেষে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাই—না, ঈশ্বর নামক কোনো সত্তা নেই। সব ভূয়া, কাল্পনিক, ছলনা। কিন্তু এ সিদ্ধান্তেও বেশিক্ষণ স্থির থাকা গেল না। ভিতরে প্রশ্নের সৃষ্টি হয় যে, আমি নিশ্চয়ই আদম, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা, মুহাম্মদ, রুমী, শ্রীচৈতন্যের চেয়ে বেশি জ্ঞানী নই! তারা সবাই ঈশ্বর-বিশ্বাসী। এদের মধ্যে তো তিনজন রয়েছেন যারা প্রত্যেকেই এক একটি শক্তিশালী ধর্মের প্রণেতা। হাজার হাজার মানুষ তাদের অনুসারী। অসংখ্য মানুষ শ্রদ্ধাভরে তাদের নাম উচ্চারণ করেন।
তাহলে আমার সিদ্ধান্ত ঠিক, নাকি তাদেরটা ঠিক। লক্ষ-কোটি মানুষ যেখানে বলছেন ঈশ্বর আছে, সেখানে ‘ঈশ্বর নেই’ বলে নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে জাহির করাটা হাস্যকর নয়? তাই দোদুল্যমানতায় ভুগতে থাকি। ঝুলতে থাকি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি কোনো একটা স্থানে।
দুই.
অতঃপর এ সিদ্ধান্তে স্থিত হতে পারি যে— না, ঈশ্বর বলে আসলেই কেউ নেই, কিছু নেই। তাহলে বিশ্বাসীরা কোথায় পেল এ ঈশ্বর? তার কাজই-বা কী? কী-ই বা প্রয়োজন এ সত্তাটির? অবশেষে বিশ্বাসীদের ঈশ্বর বিষয়ে আমার ভিতর কতগুলো ধারণার সৃষ্টি হলো। আসুন, এবার সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
প্রথমতঃ
ঈশ্বর মূলত মানব-সৃষ্ট একটি সত্তা। ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেনি, মানুষই নিজ প্রয়োজনে ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে। এরকম একটি উক্তিতে বিশ্বাসীরা ক্ষেপে যেতে পারেন। আশা করছি তারা ক্ষেপবেন না। কারণ, এ একটি ধারণা মাত্র। ধারণাকে সত্য বলে ধরে নিয়ে কেউ ভুল করবেন না নিশ্চয়ই!
‘মানুষই ঈশ্বরের স্রষ্টা’ এ ধারণাটিকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একজন মানুষের কথা ধরা যাক। মনে করুন তার নাম আমজাদ। প্রতিটি মানুষের মতোই আমজাদ বয়সপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভিতর কিছু স্বপ্নের সৃষ্টি করেছে। জীবনের একটা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে সে। মনে করা যাক, তার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে, সে ঢাকা শহরে একটি বাড়ি ও একটি গাড়ির মালিক হবে কিংবা পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য জ্ঞান সে অর্জন করবে।
তো আমজাদ মাঝ-বয়সে এসে ঢাকা শহরে একটি বাড়ি ও একটি গাড়ির মালিক হয়ে গেল কিংবা সে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য জ্ঞান-শাস্ত্রগুলো পাঠ করে ফেলল। এখন তার সামনে বাস্তবায়ন করার মতো কোনো স্বপ্ন নেই। তার জানা মতে আর কোনো জ্ঞান নেই যা সে অর্জন করেনি। ঠিক এমন একটা সময়ে আমজাদের করণীয় কী? সে কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? না, তা থাকবে না। তাহলে সে কী করবে? তার সামনে তো অর্জন করার মতো কিছুই থাকল না।
ঠিক এমন একটা মুহূর্তে আমজাদ নিশ্চিত আত্মহত্যার কথা ভাববে। কারণ, স্বপ্ন ছাড়া আমজাদ কেন, কোনো মানুষই বেঁচে থাকতে পারে না। প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিছু স্বপ্ন, কিছু আশার প্রয়োজন হয়। মানুষ সেই স্বপ্ন কিংবা আশাগুলোর পেছনে ছুটতে ছুটতে মৃত্যুর কথা ভুলে থাকে। যেমন বয়স্ক মানুষের সামনে কোনো স্বপ্ন থাকে না। তাই সে মৃত্যুর জন্য আটঘাট বেঁধে, মালকোচা মেরে প্রস্তুত হয়। আজরাইল তার জান কবয করার জন্য প্রস্তুত হয় না, সে নিজেই আজরাইলের হাতে তার জানটি তুলে দেবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কারণ, সে জানে যে সে মারা যাবে। তাকে জানানো হয়েছে একদিন যে তার মৃত্যু হবে। সে জানে যে, একদিন এই পৃথিবীর আলো-ছায়া থেকে অপসৃত হয়ে লম্বা সময়ের যে সময়ের কোনো ইতি নেই দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে তাকে। মানুষ যদি না জানত যে একদিন তার মৃত্যু হবে, তবে এ কথা নিশ্চিত, ষাট-সত্তর কিংবা আশি নয়, মানুষ আরো অনেক দিন বেঁচে থাকত। কেননা সে যখন জানত যে আমাকে হাজার বছর বেঁচে থাকতে হবে, তখন তার চোখে স্বপ্ন থাকত, জীবনের একটা স্থির লক্ষ্য থাকত। কিন্তু ব্যক্তি যখন জেনে যায় সে মরে যাবে, তখনই জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তার সমূহ স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। আশা থেকে, লক্ষ্য থেকে নিজেকে সে দূরে সরিয়ে নেয়। মানসিকভাবে সে দুর্বল হয়ে পড়ে। আগের মতো মনোবলটা আর থাকে না তার। অতঃপর ক্রমান্বয়ে সে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।
তো আমজাদের তো সব চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়ে গেল। তাহলে সে বাঁচবে কী জন্য? তার বেঁচে থাকার অর্থই-বা কী? ঠিক এমন একটা সময়ে আমজাদের পূর্ববর্তী মানুষদের রেখে যাওয়া একটা সত্তা এসে তার সামনে দাঁড়ায়। সে বলে : ‘আমাকে জানো, আমাকে খোঁজো।’ অতঃপর আমজাদ নুতন আশায় বুক বেঁধে সেই সত্তাটিকে খোঁজায় নিরত হয়। খুঁজতে থাকে, কিন্তু পায় না। পেয়ে গেলেই কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধে। অর্থাৎ সেই সত্তাটিকে পেয়ে গেলে আমজাদ আবারও স্বপ্নহীনতায় পতিত হবে। তার সামনে আর কোনো স্বপ্ন থাকবে না। তাই সে আবার আত্মহত্যার কথা ভাববে। সুতরাং অনিবার্য কারণে আমজাদ এমন একটি সত্তার অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়, যাকে কোনোদিন পাওয়া যাবে না, দেখা বা স্পর্শ করা যাবে না। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে একদিন আমজাদের সামনে মৃত্যু এসে দাঁড়ায়। আমজাদ স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নেয়। কারণ সে ভাবে, মৃত্যুর ওপারেই বুঝি সেই অদৃশ্য সত্তাটাকে পাওয়া যাবে!
আমজাদের পূর্ববর্তী মানুষেরা যদি সেই অদৃশ্য সত্তার ধারণা নাও রেখে যেত, তবুও আমজাদ সেই সত্তার খোঁজ করত। কারণ, প্রাকৃতিক বিবর্তন তার ভিতরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিত। মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে ভাবুক, সে ভাবতে ভালবাসে, অজানাকে জানার আকুতি তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই মনের ভিতর সৃষ্টি হওয়া ভাবনাগুলোর মিমাংসায় সে কোনো এক সত্তার অস্তিত্ব আবিষ্কারে ব্যাপৃত হতো। নবী ইব্রাহিমের কথাই ধরুন। ঈশ্বর কে এ নিয়ে তিনিও কম গবেষণা করেননি। চন্দ্রের আলো, সূর্যের প্রখরতা, নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা দেখে ইব্রাহিম ওগুলোকেই ঈশ্বর বলে ভাবলেন। যুক্তি দ্বারা প্রমাণের চেষ্টা করতে চাইলেন তার বিশ্বাসকে। কিন্তু যখনই অনুধাবন করলেন যে, এগুলো তো নশ্বর। তখন তার ভিতর সংশয়ের সৃষ্টি হলো। ভাবলেন, তাহলে ঈশ্বর কে? ঈশ্বর নামক কেউ আদৌ আছে কিনা? শেষমেষ তিনি স্বীয় প্রজ্ঞা ও যুক্তির অতীত এক মহা অবিনশ্বরকে ঈশ্বর হিসেবে সাব্যস্ত করে তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। এছাড়া তার কিছুই করার ছিল না। তিনি তো প্রাকৃতিক যাবতীয় কার্যের কারণ খুঁজেছেন, কিন্তু কারণের শেষ হয় না। স্বাভাবিকভাবেই একটা চূড়ান্ত কারণ তার সামনে এসে দাঁড়াল। সেই চূড়ান্ত কারণকে তিনি দেখতে পান না। অবশেষে নিজের ভিতরের হতাশাবোধটাকে দূর করার জন্যই তিনি অদৃশ্য এক ঈশ্বরের কল্পনা করলেন। এরকম একটি ঈশ্বরের কথা তাকে কিন্তু আগে কেউ বলে দেয়নি, নিজের প্রয়োজনেই তিনি সৃষ্টি করেছেন এই সত্তাটিকে।
এখানে এসে ঈশ্বরের একটা প্রয়োজন অনুধাবন করা যায়। ঈশ্বর স্বপ্নহীন আমজাদকে স্বপ্ন দেখায়, আশাহীন মানুষকে আশার বাণী শোনায়। আর এ কারণেই প্রজ্ঞাবানরা এই অদেখা-অচেনা সত্তাটিকে সৃষ্টি করলেন; যাতে মানুষ স্বপ্নহীনতার মহামারিতে না ভোগে।
অতএব, ঈশ্বর মানুষেরই সৃষ্টি।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী
