ইসলামিক ব্লাসফেমি ও স্ব-বিরোধীতা

JUNE 11, 2026

সম্প্রতি দুটি ঘটনা দুনিয়াতে বেশ সাড়া ফেলেছে আর বলা বাহুল্য দুটোই শান্তির ধর্ম ইসলামকে নিয়ে। একটা হলো – পাকিস্তানে এক খৃষ্টান বালিকার কথিত কোরান পোড়ানোর ঘটনা ও তা নিয়ে তুল কালাম কান্ড এবং মোহাম্মদকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে লিবিয়াতে মার্কিন দুতাবাস আক্রমন ও তাতে একজন মার্কিন কুটনীতিক ও আরও কয় জন কর্মচারীর হত্যাকান্ড।এ ছাড়াও মিশর ও ইয়েমেনে মার্কিন দুতাবাস আক্রমনের খবর পাওয়া গেছে। সামনে হয়ত বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আক্রমনের আরও খবর পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য দুটো ঘটনাই ইসলামি বিধান অনুযায়ী অমার্জনীয় অপরাধ- প্রথমটি কোরান পোড়ানো ও দ্বিতীয়টি মোহাম্মদের কথিত চরিত্র হনন।
কোরান পোড়ানো কিভাবে অপরাধ হতে পারে তা ঠিক বোধ গম্য নয়। কারন আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছে-

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক । কোরান, আল হিজর- ১৫:০৯

যেখানে আল্লাহ নিজেই কোরান নাজিল করে তা সংরক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছে সেখানে দুনিয়াতে দু’চারজন এমন কি হাজার হাজার লাখ লাখ কাফির মুশরিক যদি লক্ষ লক্ষ কোরান গাটের পয়সা খরচ করে পুড়িয়ে ফেলে, তাহলে কোরান তো দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা নয় কারন যা স্বয়ং আল্লাহ সংরক্ষন করবে তা কিভাবে কিছু কাফের মুশরিক নিশ্চিহ্ন করতে পারে। তাছাড়া কিভাবে তা অপরাধ হয় তাও বোঝা মুশকিল।কেউ যদি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোরান পোড়ায় তাহলে মুসলমানরাই বা উন্মত্ত হয়ে কেন হত্যা খুন লুট তরাজ রাহাজানিতে লিপ্ত হয়ে পড়বে ? মুসলমানরা যদি খৃষ্টানদের বাইবেল পোড়ায় তাহলে খৃষ্টানরা কি এভাবে মুসলমানদেরকে খুন করার জন্য পাগল হয়ে যাবে ? প্রশ্নটা একারনে যে – যেহেতু কোরান সংরক্ষনের দায় দায়িত্ব পুরোটাই আল্লাহর হাতে তাহলে মুসলমানরা কেন সে কোরান রক্ষার জন্য খুন খারাবিতে লিপ্ত হবে ? আল্লাহ কি তাহলে কোরান সংরক্ষন করতে অক্ষম ? আর সেকারনেই মুসলমানরা এ ধরনের কোরান পোড়ানোর ঘটনায় ভীত এই ভেবে যে কোন একদিন দুনিয়ার সব কাফির এক জোট হয়ে দুনিয়ার সব কোরান পুড়িয়ে শেষ করে কোরানকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে ?

এবার আসা যাক, দ্বিতীয় ঘটনায়।আমেরিকাতে কোন এক কপ্টিক খৃষ্টাণ একটা চলচ্চিত্র তৈরী করেছে যাতে মোহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে।উক্ত চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে মোহাম্মদ নারী আসক্ত ছিলেন। তো এ চলচ্চিত্র দেখে লিবিয়ার কিছু ধর্মপ্রান মুসলমান প্রচন্ড খেপে গিয়ে মার্কিন দুতাবাস আক্রমন করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এবং একজন কুটনীতিককে হত্যা ছাড়াও কয়েকজন কর্মচারীকে হত্যা করেছে। এখন বিষয় হলো মোহাম্মদ কি সত্যি নারী আসক্ত ছিলেন? দেখা যাক হাদিস কি বলে।

কাতাদা বর্ণিত: আনাস বিন মালিক বলেছিলেন., “ রাত ও দিন ব্যপী নবী তাঁর সকল স্ত্রীর সাথে মিলিত হতেন আর তাদের সংখ্যা ছিল এগার। আমি আনাস কে জিজ্ঞেস করলাম, “ নবীর কি এত শক্তি ছিল ?” আনাস উত্তর দিলেন, “ আমাদেরকে বলা হয়েছিল ত্রিশ জন পুরুষের সমান শক্তি ছিল নবীর”।সহি বুখারি, ভলিউম-১,বই-৫, হাদিস-২৬৮

উক্ত হাদিস থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে দিন ও রাতে মোহাম্মদ যে তাঁর সকল স্ত্রীর সাথে দেখা সাক্ষাত করতেন বিষয়টি মোটেও সৌজন্যমূলক দেখা সাক্ষাতের বিষয় ছিল না। তাহলে এ প্রশ্ন আসত না যে তার সে শক্তি ছিল কি না। সৌজন্যমূলক দেখা সাক্ষাত করার জন্য নিশ্চয়ই ত্রিশ জন পুরুষের সমান শক্তি দরকার পড়ে না। যে লোক তার এগারজন স্ত্রীর সাথে নিত্যদিন দেখা করে তাদের সাথে মিলিত হতেন , প্রশ্ন হলো, তাকে নারী আসক্ত বলা যায়, কি যায় না।

সুন্দরী নারী দেখলে মোহাম্মদের শরীরে কি প্রতিক্রিয়া হতো তা দেখা যায় নীচের হাদিসে-

জাবির বর্ণিত:আল্লাহর নবী রাস্তায় একজন নারী দেখলেন এবং তাকে দেখেই তাড়াতাড়ি তার স্ত্রী জয়নাবের ঘরে চলে গেলেন যে তখন একটা চামড়া রং করছিল এবং নবী তার সাথে যৌন ক্রিড়া করলেন।তারপর তিনি তার সাহাবীদের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে বললেন: স্ত্রীলোকটি অগ্রসর হয়ে একটা শয়তানের রূপ ধারন করল, তাই তোমরা যখন কোন নারীকে দেখবে তখন তোমাদের উচিত তোমাদের স্ত্রীদের কাছে যাওয়া, তাহলে তার মনে যে কামনার উদ্রেক করেছিল তার প্রশমন হবে। সহি মুসলিম, বই-৮ হাদিস-৩২৪০

ইসলামে যাকে বলা হচ্ছে শ্রেষ্ট আদর্শ মানুষ যাকে দুনিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অনুসরণ করতে হবে, তিনি রাস্তায় একটা সুন্দরী নারী দেখে সাথে সাথে দৌড়ে তার স্ত্রী জয়নাবের কাছে গেলেন ও তার সাথে যৌন ক্রিড়া করলেন।দৃশ্য কল্পটা কি অদ্ভুত! তাহলে রাস্তায় নারী দেখার পর তার দেহ ও মনে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল যে কারনে তাকে দৌড়ে গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে যৌন ক্রিড়া করতে হলো? একজন আদর্শ মানবের সাথে এ দৃশ্য কল্পটা কি মানানসই ? ঠিক একই আচরন যদি এখন কেউ করে তাকে কি বলে আখ্যায়িত করা হবে ? তাকে কি সবাই নারী লিপ্সু বলবে না ? যুক্তি হিসাবে বলা যেতে পারে যে- যৌন কাজটা তো স্ত্রীর সাথেই করা হয়েছে তাই সেটা খারাপ কিছু নয়। কিন্তু বিষয়টা হলো একজন আদর্শ মানুষের মানসিকতা ও সংযমের। একজন আদর্শ মানুষ রাস্তায় বেরুলে যদি কোন নারীর সাথে তার দেখা হয়ে যায়, তাহলেই সে উত্তেজিত হয়ে পড়বে? তার কি কোন রকম সংযম নেই ? যদি সংযম না-ই থাকে তাহলে সে কিভাবে আদর্শ মানুষ? আর তা ছাড়া নারী দেখলেই উত্তেজিত হয়ে পড়তে হবে, এটা কোন্ ধরনের সভ্য আচরন? আর যে লোক নারী দেখলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে তাকে কি নারী আসক্ত বলা যায় না ?

এখন একজন কোরান পুড়িয়েছে বলে তার বিরুদ্ধে ধর্ম দ্রোহের অপরাধ আনা হয়েছে, ধরে জেলে পোরা হয়েছে, বর্তমানে জামিনে আছে, কিন্তু আশ পাশের মুসলমানরা তাদের পরিবার শুদ্ধ পুড়িয়ে মারার হুমকি দিচ্ছে। অন্য একজন মোহাম্মদের জীবনের সত্য ঘটনাকে নিয়ে একটা চলচ্চিত্র তৈরী করেছে কিন্তু তাকে হাতের কাছে না পাওয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুতাবাস আক্রমন করে তাতে আগুন লাগানো হচ্ছে ও মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অপরাধ হলো – ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে, ইসলামকে অপমান করা হয়েছে, মোহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে।কিন্তু আসলেই কি ইসলামকে অপমান করা হয়েছে , মোহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে? উপরে কোরান ও হাদিস থেকে যে উদাহরণ দেয়া হলো তা কি প্রমান করে যে সত্যি সত্যি ইসলাম ও মোহাম্মদকে অবমাননা করা হয়েছে? কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সত্য ঘটনা জানা বা প্রকাশ করা কি তাকে অবমাননা করা ?

এখন ইসলাম বা মোহাম্মদকে অবমাননা করার কি শাস্তি সেগুলো দেখা যাক।

ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলেঃ আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাযিল করে দেখাচ্ছি যেমন আল্লাহ নাযিল করেছেন। যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! অদ্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াত সমূহ থেকে অহংকার করতে।কোরান, সূরা- আল আনাম ০৬:৯৩ ( মক্কায় অবতীর্ণ)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।কোরান, সূরা আহযাব-৩৩:৫৭
মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং মদীনায় গুজব রটনাকারীরা যদি বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে উত্তেজিত করব। অতঃপর এই শহরে আপনার প্রতিবেশী অল্পই থাকবে।কোরান, সূরা আহযাব-৩৩:৬০
অভিশপ্ত অবস্থায় তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, ধরা হবে এবং প্রাণে বধ করা হবে।কোরান, সূরা আহযাব-৩৩:৬১

উপরের আয়াত সমূহ থেকে দেখা যাচ্ছে যে যারাই আল্লাহ ও তার রসুল মোহাম্মদকে কষ্ট দেবে, তার বিরুদ্ধে গুজব রটনা করবে তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে ধরতে হবে ও হত্যা করে ফেলতে হবে। বলা বাহুল্য, মোহাম্মদকে অবমাননা করা আল্লাহকে কষ্ট দেয়ার শামিল। কারন মোহাম্মদ তো আর বর্তমানে জীবিত নেই, তাই তাকে অবমাননা করে তাকে কষ্ট দেয়া সম্ভব নয়। আর তাই এমতাবস্থায় মুমিন মুসলমানদের কর্তব্য হলো জিহাদী জোস নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অবমাননাকারীদেরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে ছারখার করে দেয়া।আর ঠিক সেটাই করছে লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেনের মুমিন মুসলমানরা যা বস্তুত তাদের পবিত্র ইমানি দায়িত্ব।কিন্তু কথা হলো- সত্য কথা বলাটা কিভাবে অবমাননা করা হয়, সত্য কথা বললে কেন মোহাম্মদের আল্লাহ কষ্ট পাবে ও রাগান্বিত হবে ? মোহাম্মদের নারী প্রীতি ছিল সেই আরব সমাজে সর্বজন বিদিত।আর তার নারী প্রীতিকে বৈধ করতে তিনি তার ওহীর নামে নিচের আয়াত পর্যন্ত নাজিল করে নেন-

কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। কোরান, সূরা আল আহযাব-৩৩:৫০

উক্ত আয়াত দ্বারা তো এটাই বুঝায় যে নবীর নারী প্রীতিকে বৈধ করাই ছিল এর নাজিলের একমাত্র উদ্দেশ্য।তাই কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বলা হচ্ছে- অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে।যদি ধরা হয় যে নীচের আয়াত দ্বারা সেটা রদ করা হয়েছে-

এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন। কোরান, সূরা আল আহযাব-৩৩:৫১

তাহলেও দেখা যাচ্ছে যে যেমন ইচ্ছা খুশী বৈচিত্রপূর্ণ নারী সঙ্গ যাতে মোহাম্মদ পেতে পারেন তার জন্য তার আল্লাহ বিশেষ সুবিধা বলবত রেখেছে এই বলে যে- তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে মোহাম্মদ মূলত: আল্লাহর এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে খায়বার বিজয়ের পর সাফিয়াকে বিয়ে করেন, আর সেটা করেন শুধুমাত্র সাফিয়ার রূপ গুণের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যা সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে হাদিসে।অর্থাৎ দরকার বোধে মোহাম্মদ উক্ত নিষেধাজ্ঞার আয়াত নাজিল করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু যখন তার বিরুদ্ধে টু শব্দ করার কেউ ছিল না ( মদিনা জীবনের শেষ দিকে )তখন তিনি আর উক্ত নিষেধাজ্ঞা মানার দরকার মনে করেন নি। এত ঘটনার পর যদি কোন লোক মোহাম্মদকে নারী লোলুপ বলে তাহলে সেটা কি ভুল বা অসত্য বলা হয় ? আর সত্য কথা বললে তা অবমাননাকর হয় কিভাবে? তবে তার চাইতে বড় প্রশ্ন হলো- সত্য বলার অপরাধে কিভাবে মানুষকে খুন করতে বলে আল্লাহ? 

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *