MARCH 28, 2024
বাংলাদেশ সংবিধানের প্রথম ভাগ (প্রজাতন্ত্র) এর ২ক ধারায় থাকা “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বিষয়ে করা আদালতের দুটি রিটের শুনানিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা দেশের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করার চেস্টা করছে। ইতিমধ্যেই হেফাজত ইসলাম রাজধানী ঢাকা, তাদের আস্তানা শহর চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা সমাবেশ করছে, অন্যান্য ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোও সমান তৎপর। হেফাজত নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাতিলের (অনেক সময়ই তারা এটাকে সংক্ষেপে বলে থাকেন- ইসলামকে দেশ থেকে বাতিলের, তুলে দেয়ার চক্রান্ত) সিদ্ধান্ত হলে- সারাদেশে জিহাদ শুরু হবে, কোটি মুসলিম বুকের রক্ত ঢেলে দিবে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, “যদি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়া হয়, তাহলে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কঠিন, কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আমরা প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেব”।
তিনি বলেন, “সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যদি বাতিল হয় তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে, সাংগঠনিকভাবে কোনো মুসলমান তার মুসলমান পরিচয় নিয়ে থাকতে পারবে না। কোনো মুসলমান মুসলমান থাকতে পারবে না”। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষদেরও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ইসলাম শান্তির ধর্ম। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকলে সবার জন্য শান্তি আসবে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য শান্তি হবে”। এমনই শান্তির ধর্ম যে, তারা জিহাদের হুমকি দেয়, ইসলাম রক্ষায় কোটি তৌহিদি জনতার বুকের তাজা রক্ত ঢেকে দেয়ার কথা বলে। যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে আহবান জানাচ্ছেন তিনি- রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকার পরেও যদি তারা থাকতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে কোন বিশেষ ধর্ম না থাকলে- কেন কোন মুসলমান মুসলমান থাকতে পারবে না- সেই ব্যাখ্যা বাবুনগরীর কাছ থেকে জানা দরকার। মুসলমানের একমাত্র সংবিধান কোরআন, যে কোরআন না থাকলে মুসলমানও থাকবে না- এই কথা সারাজীবন শুনে এসে- আজ বাবুনগরীর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে- কোরআন, কালেমা, নবীর শিক্ষা তথা সুন্নাহর চাইতেও তাদের কাছে যেনবা একটা রাষ্ট্রের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ইসলামের থাকা না থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ! দুনিয়ার অধিকাংশ দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নয়- সেইখানে কি ইসলাম নেই, এমন প্রশ্নও খুব স্বাভাবিকভাবে আসে।
বাবুনগরী আরো যুক্তি করেন, “ফুল অনেক আছে, কিন্তু জাতীয় ফুল শাপলা। মাছ অনেক আছে, কিন্তু জাতীয় মাছ ইলিশ। ফল অনেক আছে, কিন্তু জাতীয় ফল কাঁঠাল। ভাষা অনেক আছে কিন্তু আমাদের জাতীয় ভাষা বাংলা। তাহলে ধর্ম অনেক থাকলেও রাষ্ট্রধর্ম কেন ইসলাম হবে না”? বড়ই তীক্ষ্ণ যুক্তি বলতে হবে বৈকি! ফুল, মাছ, ফল- এসবের কাতারে ধর্ম তথা শাপলা- ইলিশ- কাঁঠালের কাতারে ইসলামকে তারা নিয়ে যাচ্ছেন, এটা বড়ই কৌতুকপ্রদ। যে সংখ্যাগরিষ্ঠের জোর তারা দেখাচ্ছেন- শাপলা, ইলিশ, কাঁঠালের সেই দাবি নাই, এমনকি বাংলাদেশে শাপলা, ইলিশ ও কাঁঠাল যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ফুল, মাছ ও ফল হইতো তাতে মানুষের কোন যায় আসতো না, যেমন করে- রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত প্রায় হওয়ার পরেও এইটারে জাতীয় প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করতে সমস্যা নাই। (সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুসারে- গাদা বা কচুরিপানা ফুল, পুটি মাছ, পেয়ারা/ বড়ই ফল, কাক পাখি আর ছাগল/গরু পশুরে জাতীয় ফুল-ফল-মাছ-পাখি-পশু ঘোষণা করা উচিৎ ছিল)! যাই হোক এসব জাতীয় প্রতীক নির্ধারণ করা, আর একটি রাষ্ট্রের অবস্থিত জনগোষ্ঠীর কোন অংশের ধর্ম, জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতিকে আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া- মোটেও এক কথা নয়; কেননা এর মাধ্যমে অন্যদের ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্ত্বা, সংস্কৃতিকে হেয় করা, অগণ্য করা, স্বীকৃতি না দেয়া হয়, যেটা ঐ সব জাতীয় প্রতীক করার মধ্য দিয়ে হয় না! দোয়েলরে জাতীয় পাখি করা মানে এই না যে- কাকেরা বা আর সব পাখিরা অমর্যাদাবোধে আচ্ছন্ন হচ্ছে, (বস্তুত মানুষের এইসব প্রতীক নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই)- কিংবা দোয়েল অনুসারী মানুষের বিপরীতে কাক অনুসারী, টিয়া অনুসারী, শালিক অনুসারী- এরকম মানুষেরা অপমানিত হচ্ছে। হ্যা, যখন বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়ঃ “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী”, তখন চাকমা, মারমা, খাসি, ওরাও, মনিপুরি সহ অপরাপর জাতিসত্ত্বার মানুষেরা স্বীকৃতি হারায় এবং সংবিধানিক ভাষ্য হিসাবে তারা আর বাংলাদেশের জনগণ থাকে না। ঠিক তেমনি, রাষ্ট্রধর্ম যদি কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্ম হয়, তখন অন্যান্য ধর্মের মানুষদের সেই রাষ্ট্রকে আপনার ভাবার উপায় থাকে না! রাষ্ট্র যদি সকল ধর্মের, সকল বর্ণের, সকল জাতির, সকল লিঙ্গের মানুষের হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সংবিধানে কোন বিশেষ ধর্ম, গোত্র, জাতি, লিঙ্গের প্রতি বিশেষ মর্যাদা দেখাতে পারে না, হোক না সেই ধর্ম, গোত্র, জাতি, গোষ্ঠী সংখ্যাধিক্যের কারণে বা ক্ষমতাকেন্দ্রের আশেপাশে থাকার কারণে শক্তিশালী!
খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রভৃতি নানা ইসলামিক দলগুলোও মিছিল সমাবেশ থেকে একই রকম হুশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। তাদের অধিকাংশের মূল বক্তব্যই হচ্ছে- বাংলাদেশের ৯০%, ৯২% মুসলমান হওয়ার পরেও কেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হবে না। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার বলে অন্যদের – দুর্বল, ক্ষমতাহীনদের উপরে জোর-জবরদস্তিমূলক নিজেদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া মোটেও ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায্য নয়, সেটা তাদের কে বুঝাবে? এভাবে তারা তাদের কথিত শান্তির ধর্মকে অন্যায়ের ধর্ম, জোর-জবরদস্তির ধর্ম, জংলি ধর্ম হিসাবে প্রমাণ করছে। গোটা দুনিয়া জুড়ে ইসলামের যখন এইরকম জঙ্গী, জংলি, অন্যায় রূপ বারেবারে সামনে আসতে থাকে- তখন স্বাভাবিকভাবেই এই ধর্মটি, ধর্মের গ্রন্থ, তাদের নবী, তাদের সৃষ্টিকর্তাকে কাঠগড়ায় দাড়াতে হয় বৈকি!
যাইহোক, এই সব মধ্যযুগীয় ইসলামি দলগুলো, তাদের নেতাদের, তাদের দ্বারা মগজ ধোলাই হওয়া কর্মীরা, বিভ্রান্তিতে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীদের নিয়ে বলার তেমন কিছু নেই। তার চাইতে বরং, আমাদের শিক্ষিত, প্রগতিশীল অংশ, আমাদের মূল ধারার রাজনীতিবিদদের দিকে, আমাদের ইতিহাসের দিকে, আমাদের রাজনীতির দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।
হঠাৎ করে রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গটি নিয়ে এত হট্টগোল কেন?
১৯৮৮ সালে তৎকালীন স্বৈর রাষ্ট্রপতি এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনে – এর প্রথম ভাগ (প্রজাতন্ত্র) এ ২ নং ধারার নিচেই ২ক নাম্বার সংযোজন করে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম বানায়। সেনাশাসক, কুখ্যাত এরশাদ ১৯৮৮ সালে হুট করে এটা করে- নিজের ক্ষমতাকে টিকিয় রাখতে, যখন বুঝতে পারছিল- দেশ জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন অনেক তীব্র হচ্ছে, তখন দেশের বেশিরভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে সুড়সুড়ি দিয়ে সহানুভূতি আদায় করার লক্ষ ছিল তার। ঐ সময়েই ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক আদালতে একটা রিট করেন। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে- মামলাটি দীর্ঘ ২৭/২৮ বছর ফাইলবন্দী থাকে। ২০১১ সালে আদালতের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু সংশোধনীর ব্যাপারে যুগান্তকারী রায় আসার প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে এই অষ্টম সংশোধনীর ব্যাপারে আদালাওতে আরেকটি স্বতন্ত্র রিট করা হয়। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ১৯৮৮ সালের ও ২০১১ সালের রিট দুটিকে একত্রিত করে শুনানি শুরু হয়েছে, হাইকোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চে। মতামতের জন্যে আদালত এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছেন। আগামিকাল ২৭ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। ফলে মৌলবাদী গোষ্ঠী ২৭ তারিখে তাদের ইসলামকে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের সাথে সাথে তাদের মুসলমানিত্বও খারিজ হয়ে যাবে- এইরকম বিলাপ বকছেন। যদিও, সংবিধানের তৃতীয় ভাগ (মৌলিক অধিকার) এর ৪১ নম্বর ধারা (ধর্মীয় স্বাধীনতা) অনুযায়ী সকল ধর্মের নাগরিকেরই স্বাধীনভাবে ধর্ম অবলম্বন, পালন, প্রচারের অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী
