SEPTEMBER 5, 2021
একবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে লেখনীর মাধ্যমে নাস্তিক্যবাদী দর্শন প্রচার করে আলোচনায় উঠে আসা লেখকদের ‘নব-নাস্তিক্যবাদী’(New Atheists) বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই লেখকদের মধ্যে রয়েছেন স্যাম হ্যারিস, রিচার্ড ডকিন্স, ড্যানিয়েল ড্যানেট এবং ক্রিস্টোফার হিচেন্স। এই লেখকেরা তাদের বইতে ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সাংবাদিকতার ভাষায় এই লেখকদেরকে ‘নব-নাস্তিক্যবাদী’র তকমায় ভূষিত করা হয়। এরা নাস্তিক্যবাদের চার অশ্বারোহী (Four Horsemen) হিসেবেও অভিহিত হয়ে থাকেন। নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির উপরে অগাধ আস্থা ‘নব-নাস্তিক্যবাদী’ লেখকদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় এই লেখকরা নৈতিক দায়বোধ এমনকি কখনোবা ব্যক্তিগত ক্ষোভ এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকেন। দার্শনিকভাবে তাদের অবস্থান এবং প্রস্তাবিত যুক্তিসমূহ নতুন নয়। তা সত্ত্বেও, ‘এই চার’ লেখক তাদের কাজের ধরণ ও বক্তব্যের মাধ্যমে নানাবিধ বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
পেশা ও পদ্ধতিগত দিক থেকে এই লেখকদের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। পেশার দিক দিয়ে এদের মধ্যে কেবল ড্যানিয়েল ডেনেটই একজন দার্শনিক। নব-নাস্তিক্যবাদীরা একই সাধারণ পূর্বানুমান এবং দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকেন। তাদের এই অবস্থান এবং এর পটভূমির তাত্ত্বিক গঠনকাঠামোকে ‘ ‘নব-নাস্তিক্যবাদ’’ নামে অভিহিত করা হয়। এই গঠনকাঠামোর একটি অধিবিদ্যাগত, একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং একটি নৈতিক অংশ রয়েছে। অধিবিদ্যাগত অংশে অলৌকিক বা স্বর্গীয় কোন সত্তার অস্তিত্বহীনতা সম্পর্কে এই লেখকেরা সবাই একমত। জ্ঞানতাত্ত্বিক অংশে তাদের দাবি যে, ধর্মীয় বিশ্বাস মূলত অযৌক্তিক। নৈতিক অংশের প্রস্তাবনায় তারা একটি বৈশ্বিক এবং সার্বজনীন নৈতিক মানদন্ডের অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করেন। এই নৈতিক অংশ তাদেরকে ইতিহাসের বিখ্যাত নাস্তিক নিৎসে এবং সাত্রে থেকে আলাদা করেছে। নব-নাস্তিক্যবাদীদের দাবি মতে, বিভিন্ন দিক দিয়ে বিচার করলে ধর্ম অশুভ বৈ অন্য কিছু নয়। যদিও এক্ষেত্রে ড্যানেটের অবস্থান অন্য তিনজনের চেয়ে অনেক বেশি রক্ষণাত্মক।
ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা এবং এর বুৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ব্যাখ্যায় নব-নাস্তিক্যবাদীরা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে থাকেন। ধর্মের গ্রহণযোগ্য বিকল্পের তালিকায় তারা বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেন। নব-নাস্তিক্যবাদীদের মতে, বিশ্বজগত ব্যাখ্যায় জ্ঞানলব্ধ বিজ্ঞানই একমাত্র(কিংবা সর্বোত্তম) পন্থা। কোনো বিশ্বাসকে তখনই জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব, যখন এর সপক্ষে যথেষ্ট পরিমাণ প্রমাণ উপস্থিত থাকে। নব-নাস্তিক্যবাদীরা এই বলে উপসংহার টানেন যে, বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার বদলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকার দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। তাদের দাবি অনুযায়ী, বিজ্ঞান ধর্মকে জৈবিক বিবর্তনের একটি পণ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। উপরন্তু, ইহজাতিক নৈতিকতাবোধ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে ধর্মবিশ্বাসের গন্ডীর বাইরেও উপভোগ্য জীবনযাপন করা সম্ভব।
বিশ্বাস এবং যুক্তিবাদ
নব-নাস্তিক্যবাদীদের লেখনীতে ‘বিশ্বাস’ এর একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়াটা দুরুহ একটি কাজ। তাদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে বিশ্বাসের প্রতি তাদের বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি সাধারণ চরিত্র রূপায়িত হয়। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে বলেন, ধর্মবিশ্বাস হল সাক্ষ্য-প্রমাণবিহীন অন্ধ-বিশ্বাস। এমনকি বিবদমান সাক্ষ্য-প্রমাণসমূহ ধর্মবিশ্বাসের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। একই ধারাবাহিকতায় ‘দ্য গড ডিলুশন’ বইয়ে ডকিন্স দাবি করেছেন, ধর্মবিশ্বাস আদতে অশুভ। কেননা এর বিশ্বাসীরা এর যথার্থতা নিরুপনের প্রয়োজন বোধ করে না। একইসাথে ধর্মবিশ্বাস এর বিপক্ষ মতকে সহ্য করতে পারে না। প্রথম ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, ডকিন্স মনে করেন, বিশ্বাস বুৎপত্তিগতভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়, এমনকি তা অযৌক্তিক। ডকিন্সের পরবর্তী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তিবাদের জগতে বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। বিশ্বাসের স্বরূপ সম্পর্কে স্যাম হ্যারিসের দৃষ্টিভঙ্গি ডকিন্সের প্রথমদিককার বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হ্যারিস বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস হল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে যথার্থতা-বিহীন বিশ্বাস। তার মতে, প্রমাণবিহীন কোনো বিষয়ে সুদৃঢ় আস্থা জ্ঞাপনে বিশ্বাস এক ধরণের অনুমোদন। এই অনুমোদন ধার্মিকরা একে অন্যকে দিয়ে থাকেন।
হিচেন্সের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ঐচ্ছিক চিন্তাধারার মধ্যে। ড্যানিয়েল ডেনেট এর মতে, ঈশ্বরের পক্ষে যুক্তিপরায়ণ হওয়া সম্ভব নয়। কেননা ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। ফলে ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে’ এমন বক্তব্যের কোনো যুক্তিগ্রাহ্য অর্থোদ্ধার করা সম্ভব নয়। এই অবস্থানকে সামনে রেখে ডেনেট প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব দাবিকারীরা কি আদতেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন? ডেনেটের মতে, তারা হয়তো ‘ঈশ্বরবিশ্বাস’ প্রচার করেন, কিংবা ‘ঈশ্বর বিশ্বাস’ কে বিশ্বাস করেন(তারা মনে করেন ঈশ্বর বিশ্বাস একটি কল্যাণকর ধারণা যাকে বিশ্বাস করা যায়)। ড্যানেটের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ধর্মবিশ্বাস কখনো যুক্তিগ্রাহ্য বা যৌক্তিক হতে পারে না। নব-নাস্তিক্যবাদীদের সমালোচকরা এক্ষেত্রে তাদেরকে বিশ্বাসকে যুক্তিগ্রাহ্য হিসেবে গ্রহণ করে বিকশিত হওয়া পাশ্চাত্যের দীর্ঘ দার্শনিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন । সেন্ট অগাস্টিনের হাত ধরে পাশ্চাত্যের দার্শনিক ধারার সূত্রপাত যা বর্তমান যুগে এসেও অব্যাহত রয়েছে।
নব-নাস্তিক্যবাদীরা তাদের যৌক্তিক বিশ্বাসের মানদন্ড হিসেবে বিজ্ঞানবাদের(scientism) কিছু ধারাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞানবাদের মতে, জ্ঞানভিত্তিক বিজ্ঞানই বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের একমাত্র মাধ্যম (কঠোর বিজ্ঞানবাদ)। কিংবা আরও উদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করলে, যাবতীয় যৌক্তিক বিশ্বাসের একমাত্র উৎস(উদার বিজ্ঞানবাদ)। হ্যারিস এবং ডকিন্স এক্ষেত্রে খুবই উচ্চকণ্ঠ। হ্যারিস এক্ষেত্রে যাবতীয় অ্যাধাত্মিক ও নৈতিক প্রশ্নের সমাধানের যৌক্তিক পথ হিসেবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে ডকিন্স জোর দিয়ে বলেন, একজন সৃজনশীল সত্তার অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্বের প্রশ্নটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসুতার আওতাভুক্ত একটি প্রশ্ন। আলামত-সাপেক্ষতার উপস্থিতির উপরও নব-নাস্তিকবাদীরা সমান জোর দেন। তাদের মতে, একটি বিশ্বাস তখনই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয় যখন এর সপক্ষে যথেষ্ট পরিমাণ সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে। বিশ্বাসের সপক্ষে যথেষ্ট পরিমাণে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইযোগ্য আলামত উপস্থিত থাকলেই কেবল তা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সত্য। এমন দাবি উপস্থাপনের মাধ্যমে বিজ্ঞানবাদ ও আলামত-সাপেক্ষতার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নব-নাস্তিক্যবাদীরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস অযৌক্তিক বলেই উপসংহার টানেননি। তারা আরও একধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। বরং বিবদমান সাক্ষ্য-প্রমাণ ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিপক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। “ঈশ্বর-অনুকল্প” দাবি করে, অতিমানবীয় ক্ষমতা এবং অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী একজন ব্যক্তি স্বীয় ইচ্ছা এবং সৃজনীশক্তি দিয়ে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন । ডকিন্সের যুক্তি অনুযায়ী এই অনুকল্পটি মূলত “প্রমাণবিহীন। বরং তা স্থানীয় প্রথানির্ভর ব্যক্তিগত পর্যায়ের প্রচারণার একটি বিকশিত রূপ”(২০০৬, পৃ ৩১-৩২)। জ্ঞান-ভিত্তিক পূর্বানুমানের উপর নব-নাস্তিক্যবাদীদের অতি নির্ভরতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। বিজ্ঞানবাদের সপক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক সমর্থন আছে কিনা কিংবা আলামত-নির্ভরতার সপক্ষে যথেষ্ট আলামত রয়েছে কিনা, তা নিয়ে সমালোচকেরা সন্দিহান। স্বাভাবিকভাবেই তারা নবনাস্তিক্যবাদীদের আলামত-সাপেক্ষ অনুমানসমূহকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
নাস্তিক্যবাদ বর্তমান যুগে এসেও একটি বহুল বিতর্কিত দার্শনিক অবস্থান। সুতরাং, নব-নাস্তিক্যবাদীরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষকার যুক্তিগুলোকে সময় নিয়ে বিবেচনা করবেন, এমনটা আশা করাই যায়। তারা ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিপক্ষেও বলিষ্ট যুক্তির অবতারণা করবেন, এমনটাও প্রত্যাশিত। কিন্তু এদের কেউও এক্ষেত্রে মনোযোগী নন। ডকিন্স এ বিষয়ে এক অধ্যায় খরচ করলেও, ঈশ্বরবিশ্বাসীদের যুক্তিসমূহকে অতিমাত্রায় অভিসম্পাত এবং প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বের দার্শনিক অংশকে এড়িয়ে যাবার কারণে সমালোচিত হয়েছেন। ডকিন্স দাবি করেছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিন্তু ডকিন্সের এড়িয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বের দার্শনিক অংশে ডকিন্সের এই দাবির জবাব রয়েছে। নাস্তিক্যবাদকে আবশ্যিকভাবে সত্য ধরে নিয়ে স্যাম হ্যারিস ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষ-বিপক্ষকার যুক্তিতর্কের ব্যাপারে খুব বেশি বাক্যব্যয় করেননি। ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষকার বিশ্বতাত্ত্বিক দাবির( cosmological argument) ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেই হ্যারিস উপসংহার টেনেছেন। হ্যারিসের মতে, এই দাবি মহাবিশ্ব সৃষ্টির বিকল্প সম্ভাব্যতার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে, যা ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন বলে প্রণীত মূল দাবির সাথে সাংঘর্ষিক। ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা প্রমাণ করতে হ্যারিস অশুভের অস্তিত্ব এবং পরিকল্পনাহীন নকশার (Unintelligent Design) দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একই প্রেক্ষাপটে হিচেন্স “ধর্মগুলোর অধিবিদ্যাগত দাবিগুলো মিথ্যা”, “পরিকল্পিত নকশার দাবিসমূহ” শিরোনামে কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। কিন্তু তার সাম্প্রতিককালের নিবন্ধসমূহতে তিনি নতুন কিছু বিষয় দাবি করেছেন। হিচেন্স বলেন, আজকের যুগে বিজ্ঞান ধর্মীয় পরিমণ্ডলের আওতাভুক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সক্ষম। ফলে অতীতের ন্যায় ধর্মের মুখাপেক্ষী হবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। হিচেন্সের মতে তাই, ঈশ্বর অনুকল্পটি আদতেই অপ্রয়োজনীয় । এরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, মহাবিশ্বের আপাতদৃশ্য সুনিপুণ গঠনকাঠামোর নকশাকারক কে? ড্যানিয়েল ড্যানেট ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষকার যুক্তিগুলো পর্যালোচনা শেষে সেগুলোর দূর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ড্যানেট যুক্তি দেখান যে, ঈশ্বর নামক ধারণাটির কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশাত্মক বৈশিষ্ট্য নেই। ফলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কিত তর্ক-বিতর্কের প্রেক্ষাপট নিরূপণ করা যায় না।
নব-নাস্তিক্যবাদী চার বক্তার মধ্যে ঈশ্বরের সম্ভাব্য অস্তিত্বহীনতা নিয়ে ডকিন্সের উত্থাপিত যুক্তিটির কলেবর বিস্তারিত। যদিও ডকিন্সের দাবির কোনো অবরোহগত কাঠামো নেই। একারণে তার বক্তব্যের সুস্পষ্টতা নির্ণয় করা দুরূহ। ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা প্রমাণে ডকিন্স “বোয়িং ৭৪৭ বিমান” নামক রূপক উদাহরণটি উপস্থাপন করেছেন। ডকিন্সের মতে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব একটি হ্যারিকেনের প্রভাবে লোহা-লক্কড়ের জঞ্জাল থেকে আপনাআপনি বোয়িং ৭৪৭ বিমান গঠিত হবার মতো অসম্ভব একটি ব্যাপার ( ডকিন্সের যুক্তিটি ফ্রেডরিক হয়েলের কাছ থেকে ধার করা, যদিও হয়েল তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন)। এই যুক্তির কেন্দ্রীয় প্রস্তাবনা হল, মহাবিশ্বের গঠন নকশাকারী ঈশ্বর স্বয়ং অবিশ্বাস্যভাবে জটিল এবং সম্ভাব্যতার উর্ধ্বে বিরাজমান এক সত্তা। ফলশ্রুতিতে ঈশ্বরকে ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের থেকেও জটিল এবং আরও অসম্ভাব্য একটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। ডকিন্সের মতে,একজন সুনিপুণ নকশাকারক মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এমন দাবি স্ববিরোধী। কেননা, বিবদমান সকল জটিলতাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম প্রস্তাবনা নিজেকেই ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ। ডকিন্সের মতে, ঈশ্বর-অনুকল্পটি কার্যকরণের একটি অন্তহীন চক্রের সূচনা ঘটিয়েছে, যার আদৌ কোনো অন্ত নেই। হ্যারিসও এক্ষেত্রে ডকিন্সকে সমর্থন জানিয়েছেন। হ্যারিসের মতে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাটি একটি অন্তহীন পশ্চাতগামী চক্রের সূত্রপাত ঘটায়। ফলে ঈশ্বর নিজেও কারো দ্বারা বা কোনোভাবে সৃষ্ট হয়েছেন। উইলিয়াম লেন ক্রেগের মতো সমালোচকদের মতে, ডকিন্সের যুক্তি কেবল মহাবিশ্বের গঠন-নকশায় ঈশ্বর অনুকল্পের ব্যর্থতা দেখাতে পারে ( যদিও উইলিয়াম লেন নিজে তা মানতে নারাজ)। কিন্তু এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। ক্রেগের মতে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি আবহমান ধর্মতাত্ত্বিক পূর্বানুমান রয়েছে। এই পূর্বানুমান মতে, ঈশ্বর স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে চির-বিরাজমান এবং তার অস্তিত্বের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণের প্রয়োজন নেই। লেনের মতে, ঈশ্বরের উপর জটিলতা আরোপ এবং সেই জটিলতা কেন ঈশ্বরের অস্তিত্বের যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক তা ডকিন্সের ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীদের তা জানার অধিকার রয়েছে। ক্রেগ যুক্তি দেখান যে, মানসিক কর্মপ্রক্রিয়া জটিল হলেও ঈশ্বরের মানসকাঠামো সরল হতে বাধা নেই।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী জয়
