“জীবিত মানুষের মাথার গরম মগজ আমার হাতের তালুতে বেরিয়ে আসছে” , অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের মুহূর্ত

JANUARY 1, 2019

মুক্তমনা পরিবার সাংবাদিক জীবন আহমেদকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানাবে। জীবন আহমেদ রক্ত মগজ মাখা অভিজিৎ রায় ও বন্যা আহমেদকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি দূরে দাঁড়িয়ে শুধু ছবি তুলেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করেননি, তিনি একজন সুস্থ ও আদর্শ মানুষের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের পর নয় বছর পেরিয়ে গেছে। ২৬শে ফেব্রুরারি ২০১৫, সন্ধ্যায় অভিজিৎ রায় মৌলবাদীদের হাতে খুন হয়ে যায় । তাঁর প্রিয় সাথী, স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকেও খুন করার উদ্দেশ্যে মাথা, হাত ও অন্যান্য যায়গায় চাপাতির আঘাত করা হয়।

[দুইখানি ছবি রয়েছে এখানে। প্রথমটি জীবন আহমেদের তোলা এবং পরেরটি সৈয়দ মাহমুদুর রহমানের তোলা।]

Avijit Roy Murder. February 26, 2015. Photo by: @Jibon Ahmed
Avijit Roy Murder. February 26, 2015. Photo by: @Syed Mahamudur Rahman

ফেসবুক পোস্ট, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯, জীবন আহমেদ ((Jibon Ahmed)

কেউ যদি কখনো প্রশ্ন করে- জীবন ভাল মানুষ দেখতে কেমন হয়? তখন আমার চোখের সামনে সবার আগে যে মুখটি ভেসে উঠবে, তিনি হলেন অধ্যাপক অজয় রায়। জীবিত অবস্থায় তাকে সন্তানের লাশটি নিজের কাঁধে বহন করতে হয়েছিল, এটা যে কতটা কঠিন ও কষ্টকর তা শুধু একজন বাবাই বলতে পারবেন।

মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে সরব কণ্ঠ অধ্যাপক অজয় রায়। তিনি এতটা দৃঢ়চেতা ও অদম্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, যে এই বাবা মৌলবাদীদের চাপাতির কোপে প্রাণ হারানো ছেলের লাশের সামনে বলেছিলেন, আই অ্যাম প্রাউড অব মাই সান!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী অজয় রায়। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন রাজপথে। পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে তিনি বাঙালির পরিচয় জনগণকে জানাতে বই পর্যন্ত লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ, তার মতো আর কজন করেছেন আমার জানা নেই। শিক্ষক রাজনীতির নেতা ছিলেন সেই স্বাধীনতা পূর্বেই। বিজ্ঞান ও যুক্তির চর্চায় সংগঠন করেছেন অসংখ্য। শিক্ষার আন্দোলনে তিনি সর্বাগ্রে। অথচ যুদ্ধ করে যে দেশ তিনি স্বাধীন করেছেন, সে দেশেই তার সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

মানুষটির খুব কাছে না গেলে হয়তো জানতাম না ভাল মানুষ দেখতে কেমন হয়। তার সাথে আমার যতবার দেখা হতো, বলতেন- জীবন বেঁচে থাকবে মাথা উচু করে। কোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপস করো না। নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে মানুষের জন্য কাজ করো।

অজয় স্যারের বাসায় প্রথম যেদিন ডাকলেন আমি খুব অবাক হলাম! তিনি বললেন- জীবন আসার সময় অভিজিতের মৃত্যুর সময় তোমার তোলা ছবিগুলো নিয়ে এসো। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাকে বললাম- স্যার এই ছবিগুলো আপনি দেখতে পারবেন না। আপনার দেখা ঠিক হবে না, সমস্যা হতে পারে। জবাবে স্যার বললেন- তুমি চিন্তা করো না। আমি যখন আমার সন্তানের লাশ কাঁধে বহন করতে পেরেছি, তুমি দেখে নিও ওই ছবিগুলোও আমি দেখে সহ্য করতে পারবো। তুমি নিয়ে আসো।

সন্তান হারানো একজন বাবা সেদিন আমাকে বলেছিলেন- জীবন তুমি কি চাও? আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি, শুধু মনে মনে বলেছিলাম-আপনার সন্তানের রক্ত মাখা ছবি দেখিয়ে ব্যবসা আমি করবো না। সত্যি বলছি স্যার আপনার পরিবারের কাছে আমার কখনো কিছুই চাওয়ার নেই। আপনারা আমাকে যে ভালবাসা দিয়েছেন তা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমি জীবন এখনো এই শহরে বেঁচে আছি শুধুমাত্র আপনাদের জন্য। স্যার আপনার পরিবার আমার পাশে না থাকলে হয়তো আমি আমার পরাজয় স্বীকার করে এই শহর ছেড়ে চলে যেতাম। আমি যতোবারই বিপদে পড়েছি ততোবারই ছায়ার মতো আগলে রাখেছেন আমাকে। আমি এখনো বিশ্বাস করি আপনার পরিবার আমার পাশে সারা জীবন থাকবে। যেখানেই আছেন ভাল থাকবেন স্যার। আপনার আশির্বাদ মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

জীবিত অবস্থায় আপনি ছেলের খুনিদের বিচার দেখে যেতে পারেননি। জানি না আমরাও অভিজিৎ হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো কিনা! তবে মনে প্রাণে দোয়া করি, যত দ্রুত সম্ভব এই বিচারটা হোক। আপনার আত্মা শান্তি পাক, স্থাপন হোক ন্যায় বিচার ও মানবতার দৃষ্টান্ত।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী জয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *