বিজ্ঞান, ধর্ম ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট

AUGUST 5, 2018

বাংলাদেশ এবং এদেশের মত দেশগুলোতে সত্যের চেয়ে বিশ্বাসকে, যুক্তির চেয়ে পরিচয়কে এবং প্রশ্নের চেয়ে আনুগত্যকে বেশি মূল্য দেয়। কোনো দেশের প্রায় সর্বস্তরে, শাসক, শোষক, পরিচালক, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিশেষ করে সেদেশের নাগরিকসহ প্রায় সবাই যখন যুক্তিপূর্ণ চিন্তা ও কাজে আগ্রহ হারায় তখন সেখানে প্রগতি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান ও ধর্মের তুলনামূলক সম্পর্ক নিয়ে লেখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানকার অধিকাংশ মানুষই জ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়ে অবগত নয়। বিজ্ঞান, যুক্তি, সাহিত্য, ধর্মসহ নানাবিধ জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ যোগাতে মুক্তমনা ব্লগ একটি উত্তম উদাহরণ অথচ এসব থামিয়ে দিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিৎ রায়কে নির্মমভাবে চাপাতির আঘাতে হত্যা করা হয়। এই ব্লগের অন্যতম সদস্য অনন্ত বিজয়কেও একই ভাবে হত্যা করা হয়। এই ব্লগের আরেক অন্যতম সদস্য বন্যা আহমেদকেও খুন করার উদ্দেশ্যে চাপাতির আঘাতে অঙ্গহানি ঘটানো হয়। দেশের আরো অনেক মানবাধিকার এক্টিভিস্টকে খুন দেশছাড়া করা হয়। এসকল ভয়ানক কর্মকাণ্ড বিজ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তা চর্চার  বিপজ্জনক বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।

বিজ্ঞান ও ধর্মবিষয়ক শাখায় আমার বিশেষজ্ঞতা থাকায়, পিএইচডি শেষ করার পর আমি যে বিষয়টি তীব্রভাবে অনুভব করেছি তা হলো—এই টপিকটি নিয়ে প্রায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই আগ্রহী নয়। কিছু কোর্স আউটলাইন দেখেছি, কিন্তু বিজ্ঞান ও ধর্মের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ বিষয়টি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর প্রধান কারণ তিনটি: প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে অজ্ঞ বা অনিচ্ছুক। দ্বিতীয়ত, একটি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী শ্রেণিকক্ষে এসব বিষয় আলোচনার অনুমতি দিতে চায় না। তৃতীয়ত, তরুণ শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, ফলে এই বিষয়ে গভীর গবেষণা ও অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষিত থাকে।

সরকারি অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনাও কম, কারণ নীতিনির্ধারকরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। মালয়েশিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি স্কলারশিপ ইন্টারভিউতে আমাদের বিভাগের এক বিশ্ববিদ্যালয় লেকচারার আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন—“আপনার গবেষণা বিষয়টি মালয়েশিয়ার জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক?” অথচ এই সমস্যাটি যে একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তা অনেক বুদ্ধিজীবীই বুঝতে ব্যর্থ হন—সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা তো বাদই দিলাম।

অভিজিৎ রায়ের কিছু বই পড়ার সময় আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি তাঁর গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপ্তি। গবেষণায় কোনো বই থেকে নির্দিষ্ট ধারণা ব্যবহার করতে চাইলে সেই বইটি গভীরভাবে পড়া ও বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। ইংরেজি ভাষার জটিল ও গভীর দর্শন এবং বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো বাংলায় অনুবাদ করে সাধারণ পাঠকের জন্য বোধগম্য করে তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়—মরার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতোই কঠিন। তবুও অভিজিৎ রায় অসাধারণ পরিশ্রম ও দক্ষতার সঙ্গে জটিল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরেছিলেন।

দুঃখজনকভাবে এই ফেব্রুয়ারি মাসেরই ২৬ তারিখ, ২০১৫ তে তাঁর এই অবদানের মূল্য তাঁকে জীবন দিয়ে চুকিয়ে দিতে হয়েছে। এটি আমাদের সমাজের এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের বেদনাদায়ক করুন উদাহরণ। ধর্মীয় শিক্ষার মানসিক পক্ষপাত মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে তারা সত্য ও মিথ্যার, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে।

এক অর্থে, এই জাতি জ্ঞানগতভাবে অজ্ঞ নয়—বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অজ্ঞতা (institutional ignorance), যেখানে সত্যের চেয়ে বিশ্বাসকে, যুক্তির চেয়ে পরিচয়কে এবং প্রশ্নের চেয়ে আনুগত্যকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়

বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানব সভ্যতার আত্মসমালোচনার একটি অপরিহার্য অংশ। যদি বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্র এবং সমাজ এই আলোচনা থেকে পালিয়ে যায়, তবে আমরা জ্ঞানের পরিবর্তে মতাদর্শের, এবং সত্যের পরিবর্তে কুসংস্কারের উত্তরাধিকার বহন করব।

অভিজিৎ রায়ের উত্তরাধিকার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তচিন্তা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু মুক্তচিন্তার অনুপস্থিতি একটি সমাজের জন্য আরও ভয়াবহ ধরণের বিপজ্জনক।

লেখক

রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী জয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *