JUNE 5, 2018
ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে মেরাজের ঘটনাটি এক গুরুত্বপূর্ণ এবং অলৌকিক অধ্যায়। বিশ্বাস করা হয় যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এক রাতে বোরাক নামক এক বিশেষ বাহনে চড়ে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) ভ্রমণ করেন এবং সেখান থেকে সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে যান। এটি এমন এক ঘটনা যা বিশ্বাসীদের কাছে মহানবীর মর্যাদা ও আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রতীক। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটিকে কীভাবে দেখা যায়? বাস্তবতা বনাম অলৌকিকতার এই টানাপোড়েনই আজকের আলোচনার বিষয়।
মেরাজের প্রচলিত আখ্যান
মেরাজের ঘটনাকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়: ইসরা (ভূ-পৃষ্ঠের ভ্রমণ) এবং মেরাজ (ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ)। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, ইসরার সময় মহানবী (সা.) মুহূর্তের মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেমে পৌঁছান, যেখানে তিনি অন্যান্য নবীদের সাথে নামাজ আদায় করেন। এরপর সেখান থেকে তিনি সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত যান, যেখানে কোনো সৃষ্টির পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথন করেন এবং উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে ফিরে আসেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত সম্পন্ন হয় যে, ফিরে এসে তিনি দেখেন তার বিছানা তখনও উষ্ণ ছিল এবং দরজার ছিটকিনি তখনও নড়ছিল।
এই ঘটনাকে মুসলমানরা আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শন এবং মহানবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা হিসেবে বিশ্বাস করেন। এটি বিশ্বাসীদের মনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংযোগ এবং স্রষ্টার ক্ষমতার প্রতি অবিচল আস্থা তৈরি করে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের চোখে মেরাজ
মেরাজের ঘটনাটিকে যখন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন এবং চ্যালেঞ্জ সামনে আসে:
১. গতির প্রশ্ন ও আলোর গতি: মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সেখান থেকে সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়াটা এক বিশাল দূরত্ব। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী সত্তা হলো আলো, যার গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এমনকি আলোর গতিতে ভ্রমণ করলেও সপ্ত আকাশ পাড়ি দিতে কোটি কোটি বছর লেগে যাবে, কারণ মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। বোরাক নামক বাহনটি যদি আলোর চেয়েও দ্রুতগামী হতো, তবে তা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হতো, যা বলে আলোর গতিই মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতি।
২. সময় প্রসারণ (Time Dilation): আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, যে বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলে, তার জন্য সময় তত ধীরে চলে। যদি বোরাকের গতি আলোর গতির কাছাকাছিও হয়, তাহলে পৃথিবী ফিরে এসে বিছানা উষ্ণ বা দরজার ছিটকিনি নড়তে থাকার কোনো অবকাশ থাকে না। কারণ মহানবীর জন্য যদি অল্প সময় অতিবাহিত হয়ে থাকে, তবে পৃথিবীর জন্য অনেক বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার কথা।
৩. শূন্যস্থান ও অক্সিজেন: মহাকাশে ভ্রমণ মানে শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে যাওয়া, যেখানে কোনো বাতাস বা অক্সিজেন নেই। মেরাজের বর্ণনায় কোনো ধরনের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা বা চাপ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার উল্লেখ নেই, যা একজন মানুষের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।
৪. মহাজাগতিক বিকিরণ: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং চৌম্বকক্ষেত্র আমাদেরকে মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। বায়ুমণ্ডলের বাইরে এই বিকিরণ মারাত্মক হতে পারে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। মেরাজের বর্ণনায় এই বিকিরণ থেকে সুরক্ষার কোনো উল্লেখ নেই।
৫. মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ: পৃথিবীর অভিকর্ষ বল থেকে বেরিয়ে আসা, মহাকাশে ভাসমান থাকা এবং আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা—এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। এর জন্য রকেট বা মহাকাশযানের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দরকার হয়। বোরাকের মতো একটি বাহন কীভাবে এই মহাজাগতিক শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করল, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
৬. শারীরিক সীমাবদ্ধতা: একজন মানুষের শারীরিক গঠন এবং জৈবিক প্রক্রিয়া মহাজাগতিক ভ্রমণের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। উচ্চ চাপ, শূন্য মহাকর্ষ এবং তাপমাত্রা পরিবর্তনের চরম পরিবেশ মানুষের শরীরের জন্য প্রাণঘাতী।
অলৌকিকতা বনাম বাস্তবতা
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, মেরাজের ঘটনাকে অলৌকিক হিসেবে দেখা হয়, যা বিজ্ঞানের নিয়ম দ্বারা বিচার করা যায় না। অলৌকিকতার অর্থই হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বহির্ভূত ঘটনা, যা ঈশ্বরের বিশেষ ক্ষমতা বা ইচ্ছায় ঘটে। বিশ্বাসীরা যুক্তি দেন যে, বিজ্ঞান যেহেতু প্রাকৃতিক নিয়মাবলী নিয়ে কাজ করে, তাই অলৌকিক ঘটনাকে বিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলা যায় না।
তবে একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাছে অলৌকিকতা একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। বিজ্ঞান প্রাকৃতিক ঘটনাকে প্রাকৃতিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চায়। যখন কোনো ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন তা অনুসন্ধানের দরজা বন্ধ করে দেয়। মেরাজের ঘটনাকে অলৌকিক বললে, এটি আর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের বিষয় থাকে না।
উপসংহার
মেরাজের ঘটনাটি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি গভীর বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার উৎস। এটি তাদের কাছে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতা এবং মহানবীর বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। তবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের আলোকে যখন এই ঘটনাটিকে বিচার করা হয়, তখন এটি অসংখ্য বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুটি ভিন্ন ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্র। ধর্ম বিশ্বাস ও আস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে অলৌকিকতা একটি সাধারণ বিষয়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রমাণের উপর নির্ভরশীল। মেরাজের ঘটনাটিকে যদি আক্ষরিক অর্থে দেখা হয়, তাহলে তা আধুনিক বিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক হয়। একজন প্রাক্তন মুসলিম হিসেবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে অলৌকিকতার বদলে বাস্তবভিত্তিক প্রমাণের উপর নির্ভর করতে পছন্দ করি। এই ঘটনাটি মূলত একটি রূপক বা স্বপ্নের বর্ণনা ছিল কিনা, সে বিতর্কও ধর্মীয় মহলে বিদ্যমান। তবে, বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করতে হলে অলৌকিকতার উপর ভরসা না রেখে কৌতূহল এবং যুক্তির পথেই হাঁটতে হবে।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

