OCTOBER 10, 2022
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে – কোরআনকে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা। বহু মুসলিম প্রচারক এবং পণ্ডিত দাবি করেন যে, কোরআনে এমন অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে যা ১৪০০ বছর আগে মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, এবং এটি কোরআনের ঐশ্বরিক উৎসের অকাট্য প্রমাণ। এই দাবিগুলোকে “কুরআনের বৈজ্ঞানিক মিরাকল” বা অলৌকিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এই দাবিগুলোর পেছনে কি আসলেই বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি আছে, নাকি এগুলো কেবল অপব্যাখ্যা ও স্ব-পক্ষ সমর্থনের চেষ্টা মাত্র?
দাবির মূল ভিত্তি
এই দাবিগুলোর মূল ভিত্তি হলো কোরআনের এমন কিছু আয়াতকে তুলে ধরা, যেখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, বৃষ্টির প্রক্রিয়া, পাহাড়ের ভূমিকা বা সমুদ্রের গভীরে আলোর স্বল্পতার মতো বিষয়গুলো বর্ণিত হয়েছে। দাবি করা হয় যে, এই বর্ণনাগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে হুবহু মিলে যায় এবং যেহেতু মহানবী (সা.) এর যুগে এসব জানা সম্ভব ছিল না, তাই প্রমাণ হয় যে কোরআন আল্লাহর বাণী।
কয়েকটি বহুল প্রচারিত দাবি ও তার বিশ্লেষণ
১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও প্রসারণ:
- দাবি: সূরা জারিয়াত-এর ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি নিজ ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী।” দাবি করা হয় যে এটি মহাবিশ্বের প্রসারণ (Expanding Universe) তত্ত্বের প্রমাণ।
- যুক্তি/অপব্যাখ্যা: আরবি ‘মুসিউন’ শব্দের অর্থ সম্প্রসারণকারী বা বিস্তৃতকারী। তবে এই শব্দের অন্য অর্থ ‘ক্ষমতাবান’ বা ‘প্রাচুর্য দানকারী’ও হতে পারে। কোরআন নাজিলের সময়ে ‘মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে’ এমন কোনো ধারণা মানবজাতির ছিল না। এমনকি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও, এই সম্প্রসারণ কীভাবে ঘটছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা কোরআনে নেই। বিজ্ঞান যেখানে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক মডেল ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ দেয়, সেখানে কোরআনের একটি আয়াতের বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থের মধ্যে থেকে একটিকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে মিলিয়ে দেওয়াকে অপব্যাখ্যা বলা যায়।
২. ভ্রূণতত্ত্ব:
- দাবি: সূরা মু’মিনুন-এর ১২-১৪ নম্বর আয়াতগুলোতে ভ্রূণের বিভিন্ন ধাপ যেমন, ‘নুত্বফা’ (বিন্দু), ‘আলাকা’ (রক্তপিণ্ড/জোঁকের ন্যায়), ‘মুদগাহ’ (মাংসপিণ্ড) এবং এরপর অস্থি ও মাংস গঠনের কথা বলা হয়েছে। দাবি করা হয় এটি আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের বর্ণনা।
- যুক্তি/অপব্যাখ্যা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক গ্যালেন সহ বহু প্রাচীন সভ্যতার চিকিৎসকরা ভ্রূণের বিকাশের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জানতেন। ‘আলাকা’ শব্দের অর্থ জমাট রক্ত, জোঁক বা লেগে থাকা বস্তু হতে পারে। ‘মুদগাহ’ মানে চিবানো মাংসপিণ্ড। এসব বর্ণনা একেবারেই সাধারণ পর্যবেক্ষণ, যা তৎকালীন সময়ে খালি চোখে বা সহজ সরঞ্জাম ব্যবহার করেও বোঝা যেত। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব যেখানে কোষ বিভাজন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুনির্দিষ্ট গঠন, ডিএনএ-এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়, সেখানে কোরআনের এই সাধারণ বর্ণনাকে ‘বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা’ বলাটা অতিরঞ্জন। বরং, কিছু ক্ষেত্রে প্রাচীন ভুল ধারণাও কোরআনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে দাবি করা হয় (যেমন, পুরুষের শুক্রাণুই সন্তান উৎপাদনে মূল ভূমিকা রাখে)।
৩. পাহাড়ের ভূমিকা:
- দাবি: কোরআনে বলা হয়েছে, পাহাড়গুলো পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে, যা আধুনিক ভূ-তত্ত্বের (Geology) সাথে মিলে যায়।
- যুক্তি/অপব্যাখ্যা: প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পাহাড়কে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখে এসেছে। খালি চোখেই দেখা যায় যে, পাহাড়গুলো মাটির গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এটি কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ। ভূ-তত্ত্ব যেখানে টেকটোনিক প্লেট, ভূকম্পন এবং পাহাড় গঠনের জটিল প্রক্রিয়া বর্ণনা করে, সেখানে কোরআনের এই সাধারণ বাক্যকে ‘বৈজ্ঞানিক মিরাকল’ বলাটা অতিরঞ্জিত।
৪. বৃষ্টির প্রক্রিয়া:
- দাবি: কোরআনে মেঘ, বাতাস এবং বৃষ্টির চক্রের বর্ণনা আছে, যা জলচক্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে মিলে যায়।
- যুক্তি/অপব্যাখ্যা: জলচক্রের মৌলিক ধারণা, যেমন বাষ্পীভবন, ঘনীভবন এবং বৃষ্টি, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতাতেও প্রচলিত ছিল। কোরআনে যা বলা হয়েছে তা প্রকৃতির একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ মাত্র, যা পৃথিবীর যেকোনো সভ্যতার মানুষই তাদের আশেপাশে দেখত। বৈজ্ঞানিক জলচক্রের বিস্তারিত চিত্র (যেমন, মেঘের গঠন, বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টিপাত) কোরআনে নেই।
অপব্যাখ্যার পেছনের কারণ
এই ‘বৈজ্ঞানিক মিরাকল’ দাবিগুলোর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
- বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করা: বিজ্ঞানের যুগে মানুষের বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সাদৃশ্য খোঁজা হয়।
- হীনমন্যতা দূর করা: মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকার কারণে এক ধরনের হীনমন্যতা কাজ করে। কোরআনকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে সেই হীনমন্যতা দূর করার চেষ্টা করা হয়।
- মিথ্যা সমতা স্থাপন: বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে এক ধরনের মিথ্যা সমতা স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়, যেখানে ধর্মকে বিজ্ঞানের সমকক্ষ বা তার থেকেও উচ্চতর হিসেবে দেখানো হয়।
উপসংহার: যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা
কোরআনের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার দাবিগুলো প্রায়শই অপব্যাখ্যা, শব্দচয়নের অস্পষ্টতা এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমিত ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল। কোরআন একটি ধর্মীয় গ্রন্থ, যা মূলত নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবনযাপনের নির্দেশনা দেয়। এর ভাষা কাব্যিক এবং রূপক হতে পারে, যা বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণ-ভিত্তিক ভাষার থেকে ভিন্ন।
বিজ্ঞান কাজ করে অনুমান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রমাণের মাধ্যমে। যদি কোরআন সত্যিই ১৪০০ বছর আগে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য দিত যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র আবিষ্কার করছে, তবে সেই তথ্যগুলো সুনির্দিষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ধর্মগ্রন্থকে বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে দাবি করাটা ধর্ম এবং বিজ্ঞান উভয়ের প্রতিই অবিচার। ধর্ম তার নিজস্ব জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের স্থান যুক্তিনির্ভর প্রমাণ এবং অনুসন্ধানের উপর।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

