JANUARY 1, 2023
মহাবিশ্বের বিশালতা দেখলে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। কোটি কোটি গ্যালাক্সি, অসংখ্য নক্ষত্র আর গ্রহের এই মেলা কীভাবে শুরু হলো? এই প্রশ্নের উত্তরে ধর্ম এবং বিজ্ঞান দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর ব্যাখ্যা প্রদান করে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূলে রয়েছে আল্লাহর ইচ্ছা বা ‘কুন-ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে গেল)। অন্যদিকে, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞান আমাদের সামনে তুলে ধরে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণের এক সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক চিত্র। আজকের ব্লগে আমরা এই দুটি ধারণার গভীর ব্যবচ্ছেদ করব।
কুন-ফায়াকুন: অলৌকিক আদেশের বিশ্বাস
ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য কোনো প্রাকৃতিক উপাদানের প্রয়োজন ছিল না। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ যখন কোনো কিছু সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি কেবল বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়। এই ধারণাটি মূলত একটি ‘ডিভাইন কমান্ড’ বা ঐশ্বরিক নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সময়ের কোনো বিবর্তন নেই, নেই কোনো জটিল গাণিতিক সূত্র। এটি একটি অলৌকিক প্রক্রিয়া, যা বিশ্বাসীদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে, সবকিছুই একজন বুদ্ধিমান সত্তার পরিকল্পনায় মুহূর্তের মধ্যে ঘটেছে।
তবে এই ব্যাখ্যার প্রধান সমস্যা হলো এটি কোনো ‘কীভাবে’ বা ‘প্রক্রিয়া’র উত্তর দেয় না। এটি কেবল একটি শেষ সিদ্ধান্ত জানায়। মানুষ যখন প্রশ্ন করে, মহাজাগতিক ধূলিকণা কীভাবে একত্রিত হলো? বা নক্ষত্ররা কীভাবে আলো ছড়াতে শুরু করল? তখন ধর্মীয় উত্তর আসে—সবই আল্লাহর কুদরত। এই উত্তর কৌতূহলী এবং অনুসন্ধিৎসু মানুষের মনে তৃপ্তি দেয় না, কারণ এটি প্রমাণের ধার ধারে না।
বিগ ব্যাং: প্রমাণের ভিত্তিতে সৃষ্টিতত্ত্ব
বিজ্ঞান অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে না। ১৯২০-এর দশকে এডুইন হাবল যখন লক্ষ্য করলেন যে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন মহাবিশ্বের প্রসারণের ধারণাটি সামনে আসে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, যদি মহাবিশ্ব এখন প্রসারিত হয়, তবে অতীতে নিশ্চয়ই সবকিছু এক জায়গায় ছোট এবং অতি-ঘন অবস্থায় ছিল।
বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্ব একটি অতি-ক্ষুদ্র এবং অসীম ঘন বিন্দু (Singularity) থেকে প্রসারিত হতে শুরু করে। এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না, বরং স্থান ও কালের (Space and Time) সৃষ্টি এবং প্রসারণ। এরপর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হয়েছে, মৌলিক কণা গঠিত হয়েছে, মহাকর্ষের টানে নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞানের এই দাবির পেছনে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে:
- কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB): এটি মহাবিস্ফোরণের সেই আদিম তেজস্ক্রিয়তার অবশিষ্টাংশ যা আজও মহাকাশে পাওয়া যায়।
- গ্যালাক্সির রেডশিফট: দূরবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জের আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা দূরে সরে যাচ্ছে, যা প্রসারণের প্রমাণ।
বিশ্বাস বনাম সততা
ধর্ম বলে, “তুমি বিশ্বাস করো কারণ এটি কিতাবে আছে।” বিজ্ঞান বলে, “তুমি বিশ্বাস করো না যতক্ষণ না আমি তোমাকে প্রমাণ দেখাচ্ছি।” ধর্মীয় ‘কুন-ফায়াকুন’ ধারণাটি একটি সমাপ্তি ঘোষণা করে, যা আর কোনো নতুন গবেষণার পথ খোলা রাখে না। কিন্তু বিগ ব্যাং তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে মহাবিশ্বের একটি যৌক্তিক ইতিহাস আছে।
অনেকে দাবি করেন, কোরআনেও মহাবিশ্বের প্রসারণের কথা আছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিজ্ঞান যখন কোনো সত্য আবিষ্কার করে, তখনই কেবল ধর্মতাত্ত্বিকরা সেই পুরনো আয়াতগুলোর নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করেন। একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা স্ব-পক্ষ সমর্থন। যদি ওহীর জ্ঞান সত্যিই নিখুঁত হতো, তবে বিজ্ঞান আবিষ্কার করার আগেই ধর্মতাত্ত্বিকরা বিগ ব্যাং-এর গাণিতিক মডেল দিতে পারতেন। তা তারা পারেননি।
উপসংহার
পরিশেষে, ‘কুন-ফায়াকুন’ হলো একটি কাব্যিক এবং আবেগীয় বিশ্বাস যা মানুষের অলৌকিকতার প্রতি তৃষ্ণা মেটায়। কিন্তু ‘বিগ ব্যাং’ হলো যুক্তিনির্ভর সত্য, যা মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত করে। আমরা যখন “আমি জানি না” বলে সত্যের সন্ধানে ল্যাবরেটরিতে বা টেলিস্কোপে চোখ রাখি, তখনই আমরা মানবজাতির প্রকৃত অগ্রগতি নিশ্চিত করি। অলৌকিক আদেশের চেয়ে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের রহস্য অনেক বেশি রোমাঞ্চকর এবং মহিমান্বিত।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

