OCTOBER 7, 2021
মানুষের জীবন এক নিরন্তর যাত্রার মতো, যেখানে পথের বাঁকে বাঁকে পাল্টে যায় দৃষ্টিভঙ্গি। আমার জীবনের শুরুটা ছিল আর দশটা সাধারণ মুসলিম পরিবারের মতোই। ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেখানো হয়েছিল যে, এই মহাবিশ্বের একজন মহাপরাক্রমশালী স্রষ্টা আছেন, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা এবং কোরআন পাঠ ছিল আমার প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু মনের ভেতরে সুপ্ত থাকা সেই ছোট্ট ‘কেন’ প্রশ্নটিই একদিন আমাকে বিশ্বাসের ছায়া থেকে বের করে বিজ্ঞানের অবারিত আলোয় নিয়ে আসবে, তা তখন কল্পনাও করিনি।
আমার পরিবর্তনের গল্পটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ এবং পড়াশোনার ফসল। শৈশবে যখনই আকাশে তারাদের মেলা দেখতাম বা বৃষ্টির শব্দ শুনতাম, বড়দের কাছে জানতে চাইতাম—এসব কীভাবে হয়? উত্তর পেতাম, “সব আল্লাহর কুদরত”। এই উত্তরটি সাময়িকভাবে কৌতূহল মেটালেও গভীরে এক ধরনের অপূর্ণতা রেখে যেত। বিজ্ঞান যখন সেই একই ঘটনার ব্যাখ্যা দিল—মহাকর্ষ বল, মেঘের ঘর্ষণ আর জলচক্রের মাধ্যমে—তখন প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম যে, প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া উত্তরের স্বাদ অনেক বেশি স্বচ্ছ।
ইসলামের ভেতর বড় হওয়ার সময় আমাকে শেখানো হয়েছিল যে, বিশ্বাসের ভিত্তি হলো ‘গাইব’ বা অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনা। প্রশ্ন করা সেখানে নিরুৎসাহিত ছিল না ঠিকই, তবে প্রশ্নের সীমা ছিল নির্ধারিত। যখনই আমি বিবর্তনবাদ বা মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতাম, তখনই আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হতো যে মানুষের বুদ্ধি সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, বিজ্ঞান সেই সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়েও থেমে থাকে না; বরং নিরন্তর প্রমাণের সন্ধানে ছুটে চলে। বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো এটি ভুল স্বীকার করতে জানে। নতুন কোনো প্রমাণ পেলে বিজ্ঞান তার পুরনো তত্ত্ব বদলে ফেলে, যা ধর্মের ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব।
আমার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ‘বিবর্তন তত্ত্ব’ এবং ‘আদম-হাওয়া’র গল্পের বৈপরীত্য। একদিকে কয়েক হাজার বছর আগে মাটি দিয়ে তৈরি মানুষের আদিম রূপের গল্প, অন্যদিকে কোটি কোটি বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার অকাট্য ডিএনএ প্রমাণ। যখন আমি ডারউইনের তত্ত্ব এবং আধুনিক জেনেটিক্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম, তখন আমার সামনে বিশ্বাসের দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম, প্রকৃতি কোনো অলৌকিক হাতের কারসাজি নয়, বরং কোটি বছরের অন্ধ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার ফলাফল।
বিশ্বাস ত্যাগের এই প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। পরকালের ভয়, কবরের আজাব আর দোজখের আগুনের যে ভীতি ছোটবেলা থেকে মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বের হতে যথেষ্ট মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু যখন আমি বুঝতে শিখলাম যে এই ভয়গুলো আসলে নৈতিকতা ধরে রাখার একটি প্রাচীন হাতিয়ার মাত্র, তখন ভয় নিজেই তুচ্ছ হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, ভালো কাজ করার জন্য কোনো ঐশ্বরিক পুরস্কারের প্রয়োজন নেই; বরং অন্য একজন মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারাই নৈতিকতার আসল ভিত্তি।
আজ আমি যখন আকাশের দিকে তাকাই, আমি আর কোনো আরশ বা সিংহাসন খুঁজি না। আমি দেখি এক অনন্ত মহাবিশ্ব, যা পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিন্তু সুন্দর সব নিয়ম মেনে চলছে। বিজ্ঞান আমাকে শিখিয়েছে যে আমরা এই মহাবিশ্বে এক নগণ্য ধূলিকণার সমান হতে পারি, কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করার ক্ষমতা আমাদের বিশালতা দান করে। বিশ্বাসের অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে আসার পর আমি যে মুক্তির স্বাদ পেয়েছি, তা অতুলনীয়। এখন আমি জানি না বলে ভয় পাই না, বরং সেই না-জানাকে জানার চেষ্টাই আমার জীবনের নতুন সার্থকতা।
আমার এই রূপান্তর কেবল ধর্ম ত্যাগের গল্প নয়, এটি যুক্তিবাদী হওয়ার গল্প। এটি বিশ্বাসের অন্ধকার ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে বিজ্ঞানের প্রদীপ্ত আলোয় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক ব্যক্তিগত বিপ্লব।
লেখক
রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী

